
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় বিতর্কে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। তবে নানা সমালোচনা আর অস্থিরতার ভেতরেও দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামই এখন দলের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির অন্যান্য নেতাদের কর্মকাণ্ডে জনমনে হতাশা সৃষ্টি হলেও নাহিদের পরিপক্ক নেতৃত্ব ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি দলটিকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে থাকা তরুণ নেতৃত্বের দলটি তখন দেশের মানুষের কাছে এক নতুন আশার প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু মাত্র অর্ধেক বছর পেরোতেই দলটির শীর্ষ নেতাদের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে শুরু করেছে।
দল গঠনের শুরুতেই যুগ্ম-সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর জেলা প্রশাসক নিয়োগে হস্তক্ষেপ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচনায় আসেন। কেন্দ্রীয় যুগ্ম-আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার নারী সহকর্মীকে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগে শোকজ নোটিশ পান। আব্দুল হান্নান মাসউদ, সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহসহ একাধিক নেতাও নানা বিতর্কিত ঘটনার কারণে সমালোচনার মুখে পড়েন।
সবশেষে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে মন্তব্য জনমনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না।” অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যে ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে এসব বিতর্কের মধ্যেও নাহিদ ইসলামই দলের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় অটল রয়েছেন। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ ছাড়ার পর দলীয় রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ায় তিনি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পেরেছেন। “দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা” কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি ৬৪ জেলায় জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের ইতিহাসে আগের অনেক আকস্মিক উত্থান হওয়া রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলে যায়। স্বাধীনতার পর জাসদ কিংবা ৭৫-পরবর্তী বিভিন্ন দলের মতো এনসিপিও মতাদর্শগত স্পষ্টতা, সাংগঠনিক শক্তি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ঘাটতিতে ভুগছে।
সম্প্রতি ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত এক জরিপেও দেখা গেছে, আগামী নির্বাচনে এনসিপিকে ভোট দিতে চান মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দলটির জনপ্রিয়তার বড় ধরনের পতনের ইঙ্গিত বহন করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, “এনসিপি এখনো রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ক নয়। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দরকার। প্রবীণ উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করলে দলটির জন্য তা উপকারী হবে।”
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী মনে করেন, “তরুণদের দল হিসেবেই এনসিপির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডে এখন দেশের ৮০-৯০ শতাংশ তরুণ হতাশ। ছয় মাস আগের জনপ্রিয়তার জায়গা থেকে তারা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে।”
সব মিলিয়ে, এনসিপির রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াইয়ে একমাত্র ভরসা এখন নাহিদ ইসলাম। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু একজন নেতার ওপর নির্ভর করে দল টিকে থাকতে পারবে না। শক্তিশালী বিকল্প শক্তি হয়ে উঠতে হলে এনসিপিকে অবশ্যই স্পষ্ট মতাদর্শ, সাংগঠনিক দৃঢ়তা এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণ করতে হবে।


