মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬

হাসপাতালে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ, দারিদ্র্যে ঝুঁকিতে অপুষ্টির শিকার শিশুরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দারিদ্র্য, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত অনেক শিশুর চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হলেও যাতায়াত, খাবার ও সংসারের খরচ সামলাতে না পেরে মাঝপথেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন অভিভাবকেরা। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুদের জীবন।

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের দেড় বছর বয়সী শিশু পিবির তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত। গত আগস্টে তাকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসা শেষ না করেই পাঁচ দিন পর বাড়ি ফিরতে হয়। শিশুটির মা সোনিয়া তঞ্চঙ্গ্যা জানান, হাসপাতালে থাকার খরচ ও যাতায়াতের ব্যয় বহন করার সামর্থ্য না থাকায় তাঁকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।

একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের আয়েশা বেগম। তাঁর চার বছর বয়সী ছেলে রাকিব হোসেনের হাম, নিউমোনিয়া ও তীব্র অপুষ্টি শনাক্ত হয়েছে। ছেলের চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করে চট্টগ্রাম ও রাঙামাটিতে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাঁকে। সংসারের আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সুস্থ সমবয়সী শিশুদের তুলনায় তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি ১১ গুণ বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০১৯ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, দেশে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির হার ছিল ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, জটিলতাসহ তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণত প্রায় দুই সপ্তাহ হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নানা কারণে অনেক অভিভাবক হাসপাতালে থাকতে চান না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে মাত্র ২১ হাজার ৩৬টি তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, খাদ্যনিরাপত্তার অভাব, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও অনুপযুক্ত খাদ্যাভ্যাসও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আইপিসির জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা বিভাগের ছয়টি জেলাকে তীব্র অপুষ্টির সংকটজনক পর্যায়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে অপুষ্টি শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। জটিলতাহীন তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (আরইউটিএফ) ব্যবহার করে বাড়িতে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এটি পুষ্টিসমৃদ্ধ বিশেষ খাবার, যা পানি মেশানো ছাড়াই সরাসরি শিশুকে খাওয়ানো যায়।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের নিউট্রিশন চিফ কিরোস তেফেরা আবেবে জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী শারীরিক জটিলতাহীন তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের কমিউনিটি পর্যায়ে চিকিৎসায় আরইউটিএফ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়। এটি এফ-৭৫ ও এফ-১০০ থেরাপিউটিক মিল্কের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার পরিবারগুলোর আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা, পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। এতে চিকিৎসার মাঝপথে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়া কমানো এবং শিশুদের অপুষ্টিজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট | নোঙর নিউজ

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত