মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬

তাহসিফের মৃত্যুর পর আলোচনায় টঙ্গীর মাজার বস্তি, নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর আব্দুল্লাহপুরসংলগ্ন গাজীপুরের টঙ্গীতে তুরাগ নদের তীরে প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে মাজার বস্তি। ঘনবসতিপূর্ণ এ জনপদে বসবাস করেন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। তবে আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিতির পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের কেন্দ্র হিসেবেও আলোচনায় রয়েছে বস্তিটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বস্তির মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণও হাতবদল হয়েছে। আগে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতার প্রভাব রয়েছে বলে দাবি তাঁদের।

সম্প্রতি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে বস্তিটি। গত ২৭ অক্টোবর রাতে তিনি এক সঙ্গীকে নিয়ে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। পরদিন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দাবি, কয়েকজনের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। তবে কারা তাঁদের ধাওয়া করেছিল এবং কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে তদন্ত চলছে। <Link ref=”turn748040search1″ title=”তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদন”/>।

বস্তির মাঝখানে রয়েছে হযরত সৈয়দ শাহ বোগদাদী (রহ.)-এর মাজার ও মসজিদ। এর চারপাশে টিনের ঘর থেকে শুরু করে দোতলা ও তিনতলা ভবনও গড়ে উঠেছে। বস্তির জমির প্রায় তিন বিঘা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। বাকি অংশ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও জেলা প্রশাসনের খাসজমি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নিয়ন্ত্রণের হাতবদলের অভিযোগ

স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বস্তিটি নিয়ন্ত্রণ করতেন টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রজব আলী। তাঁর সঙ্গে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, আওয়ামী লীগ নেতা আজমত উল্লাহ খান এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের চাচা মতিউর রহমান মতির প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অনেক নেতা আত্মগোপনে গেলেও স্থানীয় মাদক কারবারিরা এলাকায় থেকে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপর বস্তির নিয়ন্ত্রণে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে।

তাঁদের দাবি, বর্তমানে শাহাবুদ্দীন দাবারুর প্রভাব রয়েছে বস্তিতে। তাঁর সঙ্গে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাজারপাড়া ইউনিট বিএনপির নেতা সিদ্দিকুর রহমান ডুবলী, রবিউল ইসলাম বাবু ওরফে কিং বাবু, আরাফাত ওরফে ইয়াবা আরাফাত, ক্যাসেট শামীম, স্থানীয় বিএনপি নেতা রাশেদুল ইসলাম কিরণ, ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আলকাস মিয়া এবং মাজারপাড়া ইউনিট বিএনপির নেতা নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।

বস্তির পাশের হোন্ডা রোডে টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির হাজীর মাজার ইউনিটের একটি দোতলা কার্যালয় রয়েছে। বস্তির বিভিন্ন গলির মুখেও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নামে কার্যালয় দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, এসব কার্যালয়ে দিনভর নেতাকর্মীদের আনাগোনা থাকে। তাঁদের অভিযোগ, বস্তিতে প্রায় ৫১০ জনের একটি ক্যাডার বাহিনী রয়েছে, যাদের কারও কারও কাছে অবৈধ অস্ত্রও আছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এসব কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেগুলোতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সাইনবোর্ড ওঠে। বস্তির বিভিন্ন স্থানে বিএনপি নেতা ও সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিলবোর্ডও দেখা যায়।

চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাসেট শামীম ও কিং বাবু আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তাঁরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ক্যাসেট শামীমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন। তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতা রাশেদুল ইসলাম কিরণের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং বস্তির আশপাশে চাঁদা তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, কিং বাবু মাদকের আখড়াগুলো থেকে চাঁদা সংগ্রহ করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। আরাফাত ওরফে ইয়াবা আরাফাত তাঁর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মাদক কারবারের আখড়া ও ফুটপাত থেকে আদায় করা চাঁদার একটি বড় অংশ স্থানীয় বিএনপি নেতা জাবেদ আহমেদ সুমন ওরফে সুমন সরকারের কাছে যায় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করা এবং উচ্ছেদ ও মাদকবিরোধী অভিযান ঠেকানোর কাজে তিনি ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে কয়েকজন প্রভাবশালী নারীর সম্পৃক্ততার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া না গেলে অভিযোগগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।

ক্যামেরা ও পাহারায় নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ

সরেজমিনে দেখা গেছে, বস্তির প্রবেশপথগুলোতে লোকজনের চলাচল নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রবেশপথে পাহারার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা অপরিচিত কাউকে দেখলে পরিচয় জানতে চান। কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে মুঠোফোনে অনুমতি নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

টঙ্গীর দুটি সড়ক ও তুরাগ নদের তীর দিয়ে বস্তিতে প্রবেশ করা যায়। স্থানীয়দের দাবি, সড়কপথে বাধা বা পুলিশের তল্লাশি থাকলে নৌপথে মাদক আনা হয়।

বস্তিতে প্রবেশের পর কয়েকজন যুবক পরিচয় জানতে চান। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তাঁরা তাহসিফের মোটরসাইকেল কোথায় রাখা হয়েছিল এবং কোন গলি দিয়ে তিনি প্রবেশ করেছিলেন, তা দেখিয়ে দেন। তবে প্রকাশ্যে মাদকসেবী বা বিক্রেতাদের ছবি ও ভিডিও ধারণ না করার বিষয়ে সতর্ক করেন তাঁরা।

বস্তির বিভিন্ন স্থানে নারী-পুরুষকে জটলা করে বসে থাকতে দেখা যায়। পাশেই রয়েছে দুটি বড় পোশাক কারখানা। ইজতেমা মাঠের ২৬ ও ২৭ নম্বর টয়লেট ভবনের মাঝখান দিয়ে মাঠে প্রবেশের পথ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় ওই এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। দিনের বেলাতেও টয়লেট ভবনের পেছনে এবং কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের কার্যালয়ের আশপাশে মাদকসেবীদের আড্ডা দেখা যায়।

স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যার পর থেকে রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাদক কারবার বাড়ে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সেখানে এসে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক কেনেন ও সেবন করেন। মাদক কারবারিদের প্রভাবের কারণে পুলিশও সহজে সেখানে অভিযান চালাতে পারে না বলে অভিযোগ তাঁদের।

এর আগে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে ডিবি ও থানা পুলিশের সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন বলেও স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের ভাষ্য, মাদক কারবারিদের হামলায় পুলিশের পরিদর্শকসহ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছিলেন।

গত ২৬ অক্টোবর মাদক কারবার নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য গেলে স্থানীয় এক সাংবাদিককে অপহরণ করে বস্তিতে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। প্রায় দুই ঘণ্টা নির্যাতনের পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

উচ্ছেদের পর আবার দখলের অভিযোগ

গত ৩১ আগস্ট টঙ্গী বাজারের কলকারখানা অধিদপ্তরসংলগ্ন এলাকায় রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে অংশ নেওয়া রাজউকের উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) লিটন সরকার জানান, হাজী মাজার বস্তি এলাকায় রাজউকের প্রায় তিন বিঘা জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব জমি মাদকসেবী ও কারবারিদের দখলে ছিল। মাদকের বিস্তার ঠেকাতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে জমি বুঝে নেওয়া হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও বস্তির বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবার ও অবৈধ দখল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

‘মাদক কারবার ৯৫ শতাংশ কমেছে’—দাবি বিএনপি নেতার

মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার চলে—এমন অভিযোগের বিষয়ে টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও গাজীপুর মহানগরীর ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম কিরণ বলেন, বিএনপি কখনো মাদক কারবারকে প্রশ্রয় দেয় না। পুলিশ কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বস্তির যেসব এলাকায় মাদকের কারবার হতো, সেগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে।

কিরণের দাবি, বস্তিতে মাদক কারবার ৯৫ শতাংশ কমে গেছে। এখন বহিরাগত কিছু লোক ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা মাদক বিক্রি করছে। তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতাকর্মী মাদক কারবারে জড়িত নন বলেও দাবি করেন তিনি।

ইউনিট বিএনপির নেতা সিদ্দিকুর রহমান ডুবলী বলেন, আগে আওয়ামী লীগের লোকজন বস্তি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাঁদের সরিয়ে এখন তাঁরা বস্তির পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখছেন।

‘মাদকের আখড়া গুঁড়িয়ে দিয়েছি’—পুলিশ

বস্তিতে প্রকাশ্যে মাদক কারবার ও ক্যাডার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের বিষয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, বস্তির মূল মাদকের আস্তানা আগেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ নিয়মিত সেখানে টহল ও তল্লাশি অভিযান চালায়। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, মাদক কারবারিরা যতই শক্তিশালী হোক, কাউকে মাদক কারবার করতে দেওয়া হবে না।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে টঙ্গীর মাজার বস্তির মাদক কারবার, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণে কারা জড়িত এবং তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে বস্তির কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত