মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে অনিয়ম-চাঁদাবাজির অভিযোগ, তদন্ত দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চট্টগ্রাম অস্ত্র শাখাকে ঘিরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ভুয়া ভ্রমণ ভাতা (টিএ) বিল তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বাহিনীর ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহ। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্য ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, দায়িত্বের অতিরিক্ত পদ ব্যবহার করে তিনি বদলি বাণিজ্য, অবৈধ স্থাপনা থেকে মাসোহারা আদায় এবং দায়িত্ব পালন না করেও ভাতা উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের শেষ দিকে সাব-ইন্সপেক্টর পদে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেন সালামত উল্লাহ। দীর্ঘ কর্মজীবনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন চৌকি ও সার্কেলে দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে ইন্সপেক্টর পদে রয়েছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ইন্সপেক্টর পদে থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম অস্ত্র শাখার চিফ ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সহকারী কমান্ড্যান্টের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। এ নিয়ে বাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ রয়েছে বলে দাবি কয়েকজন সদস্যের।

অবৈধ স্থাপনা থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের কদমতলী পোস্তারপাড় এলাকার বিভিন্ন বস্তিঘর, অবৈধ স্থাপনা ও ছাগলের বাজার থেকে মাসে প্রায় ১৩ হাজার টাকা আদায় করা হয়। কদমতলীর একটি রেলওয়ে কোয়ার্টারের সীমানার ভেতরে ফলের ক্যারেট রাখার জন্য মাসে চার হাজার টাকা এবং ফলমন্ডি এলাকায় রেলওয়ের কোয়ার্টার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া পলোগ্রাউন্ড ব্রিজের নিচে ফলের ক্যারেট রাখার বাবদ মাসে পাঁচ হাজার টাকা এবং হাটহাজারীর জানআলীর হাট রেললাইনসংলগ্ন অবৈধ দোকানপাট ও বস্তিঘর থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কালুরঘাট এলাকায় রেলওয়ের বেদখল হওয়া স্থাপনা থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, এসব অর্থ আদায়ে সালামত উল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কাজ করেন। তবে অভিযোগগুলোর পক্ষে পূর্ণাঙ্গ নথি বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

ভুয়া টিএ বিল ও ‘ভগবান ডিউটি’র অভিযোগ

রেলওয়ের কর্মীদের প্রচলিত ভাষায় ‘ভগবান ডিউটি’ বলতে কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও হাজিরা বহাল রেখে বেতন-ভাতা গ্রহণের অভিযোগকে বোঝানো হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্যের দাবি, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের অস্ত্র শাখায় কাগজে-কলমে ৮০ জন সদস্য থাকলেও তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না। এভাবে দায়িত্বে অনুপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে সদস্যপ্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।

একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন না করেও কয়েকজন সদস্যের নামে ২৬ থেকে ২৮ দিনের টিএ বিল তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এসব বিলের একটি অংশ সালামত উল্লাহ নেন বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সদস্য। তাঁদের ভাষ্য, বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় তাঁর স্বাক্ষর ব্যবহৃত হয়।

এ ছাড়া ট্রেনে এসকর্ট ডিউটির নামে অতিরিক্ত টিএ বিল তৈরি এবং দায়িত্ব পেতে কমিশন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সার্কেল থেকে টিএ বিলের পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চাওয়া হয়। অর্থ দিতে দেরি হলে বদলির ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সদস্য।

চোরাই মালামাল উদ্ধারের ঘটনায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

সম্প্রতি মতিয়ার পুল এলাকার দরবার ট্রেডিং নামের একটি ভাঙারির দোকানে রেলওয়ের চোরাই লোহা পাওয়ার অভিযোগে আজগর নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া রেলওয়ের ওয়ার্কশপ থেকে মালামাল চুরির ঘটনায় আটক দুই ব্যক্তিকে সমঝোতার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার মামলা, জব্দতালিকা বা তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করা প্রয়োজন।

বাহিনীর সদস্যদের ক্ষোভ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাব-ইন্সপেক্টর অভিযোগ করে বলেন, বাহিনীর কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কারণে সাধারণ সদস্যরা নানা ধরনের চাপের মধ্যে থাকেন। টিএ বিলের অর্থ দিতে দেরি হলে বকাঝকা ও বদলির হুমকি দেওয়া হয় বলে তাঁর দাবি। প্রতিবাদ করলে দূরবর্তী বা অসুবিধাজনক সার্কেলে বদলি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে সালামত উল্লাহর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে আরএনবি সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এসব অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট মোরশেদ আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, এসব বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার এখতিয়ার তাঁর নেই। তিনি নতুন দায়িত্বে এসেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম বলেন, “নিয়মবহির্ভূতভাবে ভুয়া টিএ-ডিএ বিল নিয়ে কারসাজি অফিসের বিধিমালা লঙ্ঘনের শামিল। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ওঠা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত