
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেছেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি তার বাস্তবায়ন আদেশের মধ্য দিয়েই হতে হবে। এ সংকট সমাধানের অন্য কোনো বিকল্প নেই। আগামী ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে অবিলম্বে এ আদেশ জারি করতে হবে।
মঙ্গলবার এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সামান্তা শারমিন জানান, জুলাই বিপ্লবীদের হাত ধরে গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি মাত্র আট মাসের বয়সে দেশের ইতিহাসের কঠিনতম নির্বাচন মোকাবিলা করতে যাচ্ছে। তবুও তারা আত্মবিশ্বাসী—এবারের নির্বাচনে এনসিপি তরুণদের প্রতিনিধিত্বের এক নতুন ধারা তৈরি করবে।
তিনি বলেন, “৫ আগস্ট-পরবর্তী রাষ্ট্রে আমাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিলোপ। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রণয়নের অঙ্গীকার নিয়েই আমরা ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করি। ঐকমত্য কমিশনে এনসিপি সেই বন্দোবস্ত প্রণয়নে সর্বোচ্চ দৃঢ়তা দেখিয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে ২৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছি।”এনসিপির নির্বাচন প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে সর্বাধিক মনোনয়নপত্র বিক্রির রেকর্ড গড়বে এনসিপি। “এক দিনে অনলাইনে ৪৮ জন মনোনয়ন ফরম পূরণ করেছেন, আর অফিস থেকে সরাসরি নিয়েছেন আরও ১০ জন। আমরা আশা করছি, সর্বোচ্চসংখ্যক মনোনয়ন আবেদন বিক্রি হবে এবং এনসিপি এবার সংসদে জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধি পাঠাবে।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা
সামান্তা শারমিন বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার এখনো যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। সম্প্রতি একটি দলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর সারা দেশে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা তারা মোকাবিলা করতে পারেনি। কোথাও গোয়েন্দা তৎপরতা, কোথাও আগাম সতর্কতা—কিছুই দেখা যায়নি। ফলে আমার মনে হয় না যে ভোটের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি সরকারের আছে।”তিনি আরও বলেন, “বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গ্রুপিং ও সেখান থেকে উৎসাহ পাওয়া সন্ত্রাসী কার্যক্রম এখন বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণ নাগরিক ও ভোটারদের এসব থেকে রক্ষা করতে পারবে বলে আমাদের মনে হয় না।”
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনি আদেশ জরুরি
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে অনৈক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সব দলকে এ ঐকমত্যে আসতে হবে যে, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি তার বাস্তবায়ন আদেশের মধ্য দিয়েই হতে হবে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট থেকে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নির্বাহী ক্ষমতাবলে এ আদেশ জারি করতে হবে। সনদে কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রাখা যাবে না। এ ছাড়া এ সংকট সমাধানের অন্য কোনো বিকল্প নেই।”তিনি আরও বলেন, “যদি এর অন্য কোনো বিকল্প থেকে থাকে, আমরা তা শুনতে আগ্রহী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিকল্প নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে না চাইলে এখনই এ আদেশ জারি করা জরুরি।”
নির্বাচনি ব্যয় ও দলীয় ফান্ড পরিকল্পনা
নির্বাচনি ব্যয় প্রসঙ্গে এনসিপি নেত্রী বলেন, “আমরা স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচনি প্রক্রিয়ার উদাহরণ গড়তে চাই। এজন্য কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি কাজ করছে। নির্বাচনি ব্যয় সামলাতে আমরা দুইভাবে ফান্ড সংগ্রহ করব—প্রথমত, দলীয় ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নেওয়া হবে; দ্বিতীয়ত, প্রতিটি আসনে পছন্দের প্রার্থীর নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে সহযোগিতা করতে আগ্রহীরা সরাসরি সহায়তা দিতে পারবেন।”তিনি আরও জানান, এনসিপি চায় ভোটের অর্থনীতি থেকে দুর্নীতির সংস্কৃতি মুছে দিতে। জনগণের অংশগ্রহণমূলক তহবিল ব্যবস্থাই হবে তাদের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মূল আকর্ষণ।
জোট রাজনীতি নয়, একক লড়াইয়ে আগ্রহী এনসিপি
নির্বাচনি জোটের বিষয়ে সামান্তা শারমিন বলেন, “আমরা এককভাবে নির্বাচন করতে বেশি আগ্রহী। সেই লক্ষ্য ধরে আমরা প্রার্থী তালিকা তৈরি করছি। তবে যদি জোট হয়, সেটা অবশ্যই পরিবর্তনকামী এবং সংস্কারপন্থি দলগুলোর সঙ্গে হতে পারে।”তিনি আশা প্রকাশ করেন, তরুণদের অংশগ্রহণ ও জনগণের আস্থা নিয়েই এনসিপি আগামী নির্বাচনে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।