
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটে একটি বোর্ডিং হাউসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ অন্তত নয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় শহরটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত দেশে ফিরছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে থাকা অনেকে কলকাতা ভ্রমণের পূর্বপরিকল্পনাও স্থগিত করছেন।নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, স্যাডার স্ট্রিট ও কলিন স্ট্রিট এলাকার হোটেল সমিতি এবং ট্রাভেল এজেন্টদের বরাতে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের পর গত কয়েক দিনে আগাম ফিরতি টিকিট করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টা ৪০ মিনিটে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ১৫জি নম্বর পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ‘শিখা ইন’ নামের একটি বোর্ডিং হাউসে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে সাত বাংলাদেশিসহ অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়।পশ্চিমবঙ্গের ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি পরিষেবা মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, ওই বোর্ডিং হাউসে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না এবং বৈধ পরিচালন পারমিটও ছিল না।অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা পৌরসভা (কেএমসি) পুরো শহরের বোর্ডিং হাউসগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি অডিট দল গঠন করেছে। পাশাপাশি ভবনের মালিক বীরেশ্বর মিত্রের সন্ধানে কলকাতা পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে।এদিকে দুর্ঘটনার খবর বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশি পর্যটকদের স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। পরিবারের সদস্যরা ভারতে থাকা স্বজনদের দ্রুত দেশে ফেরার পরামর্শ দিচ্ছেন।অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই ভবনেই অবস্থান করছিলেন পাবনার বাসিন্দা মো. খুরশীদ আলম। পরে তিনি মারকুইস স্ট্রিটের অন্য একটি হোটেলে ওঠেন। তিনি জানান, আগুনের খবর ও বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর পর স্ত্রী ও বাবা-মা বারবার ফোন করে দেশে ফিরে যেতে বলেছেন। ব্যবসায়িক কাজ শেষ করে তিনি শুক্রবার বিকেলেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছেন।
শুধু অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্ক নয়, প্রশাসনিক অভিযান ও তদন্তের মধ্যে হোটেলে অবস্থান করে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কাতেও অনেকে কলকাতা ছাড়ছেন। ঢাকার বাসিন্দা ইসমাইল সরকার জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশে ফিরে যাওয়াকেই নিরাপদ মনে করছেন তিনি।কলকাতার স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট গোপাল মান্না বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর অনেক পর্যটক আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকে জরুরি ভিত্তিতে ফিরতি টিকিট করে দেওয়ার অনুরোধ করছেন।এই দুর্ঘটনার প্রভাব পড়েছে কলকাতার নিউ মার্কেট ও আশপাশের ব্যবসায়ও। বাংলাদেশি পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত। করোনাভাইরাস মহামারি ও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে একসময় প্রতিদিনের বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা ঐতিহাসিক গড় প্রায় ৮ হাজার থেকে নেমে প্রায় ১ হাজারে দাঁড়িয়েছিল।গত জুলাইয়ে ভিসা প্রক্রিয়া কিছুটা শিথিল হওয়ার পর বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়তে শুরু করলে নিউ মার্কেট ও আশপাশের হোটেল, রেস্তোরাঁ ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিলেন। কিন্তু মির্জা গালিব স্ট্রিটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর নতুন করে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় সেই ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধার আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশি পর্যটকদের সংখ্যা কমে গেলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও খুচরা ব্যবসায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে দ্রুত অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করে পর্যটকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে।