চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় দুর্ঘটনাকবলিত এমটি রাসি (MT Rashi) জাহাজের গ্যাস-ফ্রি সনদ প্রদান এবং সংশ্লিষ্টদের দায় তদন্তের দাবিতে বিস্ফোরক পরিদপ্তর ঘেরাও করেছে জাহাজভাঙা শ্রমিক সেফটি কমিটি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে সেফটি কমিটির উদ্যোগে চট্টগ্রামে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে মিছিল নিয়ে উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিক নেতারা। কর্মসূচি শেষে উপমহাপরিদর্শক ড. মো. আসাদুল ইসলামের মাধ্যমে মহাপরিদর্শক বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
সমাবেশে শ্রমিক নেতারা প্রশ্ন তোলেন—যে জাহাজকে গ্যাস-ফ্রি সনদ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই জাহাজে কাজ করতে গিয়ে কীভাবে প্রাণঘাতী মাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে একসঙ্গে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হলো? তারা এমটি রাসির গ্যাস-ফ্রি সনদ প্রকাশ, সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া তদন্ত এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানান। সেফটি কমিটির সদস্য সচিব মো. আলীর সভাপতিত্বে এবং জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্যকেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন, স্কপের যুগ্ম সমন্বয়ক রবিউল হক শিমুল, বিএফটিইউসির সাধারণ সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ, বাংলাদেশ মুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মো. ইদ্রিছ, জাহাজভাঙা যুব নেটওয়ার্কের সদস্য আবু আহমেদ মিয়া এবং জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিনসহ অনেকে। সমাবেশে টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত বলেন, গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ করার সময় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ঘটনাস্থলে নয়জন শ্রমিক নিহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ আগস্ট আরও একজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা ১০ জনে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জাহাজের ভেতরে থাকা বিপজ্জনক গ্যাস ও পদার্থ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জাহাজভাঙার কাজে ব্যবহারের আগে এমটি রাসি জাহাজটি বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পক্ষ থেকে গ্যাস-ফ্রি সনদ পেয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তিনি প্রশ্ন করেন, যদি জাহাজটি গ্যাস-ফ্রি হিসেবে প্রত্যয়ন করা হয়ে থাকে, তাহলে শ্রমিকরা কীভাবে প্রাণঘাতী মাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হলেন? একই ঘটনায় কীভাবে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হলো?
তিনি অবিলম্বে এমটি রাসির গ্যাস-ফ্রি সনদের সত্যায়িত কপি প্রকাশ এবং সনদ প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানান। সেফটি কমিটির সদস্য সচিব মো. আলী বলেন, গ্যাস-ফ্রি সনদ প্রদানের সময় জাহাজের কোন কোন অংশ, ট্যাংক ও কম্পার্টমেন্ট পরীক্ষা করা হয়েছিল, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাইড্রোজেন সালফাইডসহ অন্যান্য বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাসের মাত্রা কত ছিল, পরীক্ষার সময় কী ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল এবং সনদ দেওয়ার পর জাহাজে প্রবেশ ও কাটিংয়ের আগে পুনরায় গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
তিনি দুর্ঘটনাস্থলে গ্যাসের প্রকৃত মাত্রা এবং গ্যাসের উৎস বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি জানান।
বিলস চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু ইয়ার্ড মালিকের দায়িত্ব নয়; সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, পরিদর্শন ও প্রত্যয়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন, কোনো জাহাজকে গ্যাস-ফ্রি ঘোষণা করার পরও যদি সেখানে প্রাণঘাতী বিষাক্ত গ্যাসে একসঙ্গে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে, তাহলে ওই সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব গভীরভাবে তদন্ত করা জরুরি।
গ্যাস-ফ্রি সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি, ভুল তথ্য প্রদান, যথাযথ পরীক্ষা না করা কিংবা বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ মুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মো. ইদ্রিছ এবং জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিনসহ অন্যান্য বক্তারা বলেন, দুর্ঘটনার জন্য জাহাজের মালিক বা আমদানিকারক, ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, গ্যাস পরীক্ষাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং গ্যাস-ফ্রি সনদ প্রদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের দায় পৃথকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
তারা বলেন, তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি কিংবা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বক্তারা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটিতে জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে অভিজ্ঞ প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। পাশাপাশি নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ডে শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত না করার দাবি করেন।
১২ দফা দাবি
সমাবেশ থেকে জাহাজভাঙা শ্রমিক সেফটি কমিটির পক্ষ থেকে ১২ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—এমটি রাসির গ্যাস-ফ্রি সনদ যাচাই ও প্রকাশ, সনদ প্রদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তদন্ত, গ্যাস পরীক্ষার রিপোর্ট ও লগবুক যাচাই, দুর্ঘটনাস্থলে গ্যাসের উৎস নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। শ্রমিক নেতারা বলেন, ১০ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ঘেরাও কর্মসূচি শেষে শ্রমিক নেতারা উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন এবং মহাপরিদর্শক বরাবর স্মারকলিপি দেন। স্মারকলিপি গ্রহণকালে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক ড. মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, ব্যালাস্ট ট্যাংক পরীক্ষা করা বিস্ফোরক পরিদপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তবে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, একটি দুর্ঘটনা মানেই একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাওয়া। তাই কোনো দুর্ঘটনাই কাম্য নয়। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়া হবে। শ্রমিক নেতারা বলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের কোনো বিকল্প নেই। তারা অবিলম্বে তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জাহাজভাঙা শিল্পে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান।