
একটি প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। একটি পলিথিন ব্যাগের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় হয়তো একবারের কেনাকাটাতেই। কিন্তু মানুষের সাময়িক সুবিধার জন্য ব্যবহৃত সেই প্লাস্টিক প্রকৃতিতে থেকে যেতে পারে শত শত বছর। ফলে কয়েক মিনিটের ব্যবহার আজ পরিণত হচ্ছে প্রকৃতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংকটে।প্লাস্টিক দূষণ এখন আর শুধু পরিবেশবাদীদের উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বড় সংকট। তাই প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে লড়াইকে এখন একটি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা জরুরি।বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার বা ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে না। ফলে এসব বর্জ্য জমা হচ্ছে রাস্তার পাশে, খাল-নদীতে, ড্রেন, কৃষিজমি ও বিভিন্ন জলাশয়ে।বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে প্লাস্টিক বর্জ্য ভয়াবহ সমস্যা তৈরি করে। পলিথিন ও অন্যান্য প্লাস্টিক ড্রেন ও নালা আটকে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। নগরজীবনে দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি চাপ।
অন্যদিকে খাল ও নদীতে জমে থাকা প্লাস্টিক জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী খাবার মনে করে প্লাস্টিক গ্রহণ করতে পারে। আবার বিভিন্ন প্লাস্টিক বর্জ্য ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি করে, যা পরিবেশ ও খাদ্যচক্রে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করে।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় সমস্যার অংশ হয়েও তা উপলব্ধি করতে চাই না। দোকান থেকে একটি পলিথিন নেওয়া, রাস্তায় পানির বোতল ফেলে দেওয়া কিংবা পিকনিক শেষে প্লাস্টিকের প্লেট, কাপ ও প্যাকেট যেখানে-সেখানে ফেলে চলে আসাকে অনেকেই ছোট বিষয় হিসেবে দেখেন।কিন্তু কোটি মানুষের এমন ছোট ছোট অসচেতন আচরণ একত্রিত হয়ে সৃষ্টি করছে বিশাল পরিবেশগত সংকট। তাই প্লাস্টিক দূষণ কমাতে শুধু আইন বা প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন।একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাপড় বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করা, পানির জন্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতল রাখা, প্লাস্টিক বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং সম্ভব হলে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনা—এসব ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, ভোক্তা, স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে এ ক্ষেত্রে।
প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, প্রতিটি নাগরিকের। আমরা যদি আজ থেকেই প্লাস্টিক ব্যবহারে সংযমী হই এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল আচরণ করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ হয়তো নীরব। কিন্তু এর ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী। কয়েক মিনিটের সুবিধার জন্য শত বছরের পরিবেশগত সংকট তৈরি না করে এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সুবিধার চেয়ে প্রকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেব।কারণ প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; এটি আমাদের নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
লেখক: মো. আব্দুল জাহিদ