প্রতি বুধবার এলেই পাট বেচাকেনায় সরগরম হয়ে ওঠে মানিকগঞ্জের ঘিওর হাট। দূরদূরান্ত থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পাট নিয়ে আসেন এই হাটে। দরদাম শেষে হাতবদল হয় হাজার হাজার মণ পাট, লেনদেন হয় কোটি টাকার। বাজারে পাটের ভালো দাম থাকলেও আগের মতো সরবরাহ নেই। নতুন হাটবাজার গড়ে ওঠা, পাটের আবাদ কমে যাওয়া এবং নদীভাঙনে হাটের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় ৩০০ বছরের বেশি পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী হাট হারাতে বসেছে অতীতের জৌলুস।ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদীর কাছাকাছি গড়ে ওঠা ঘিওর হাট একসময় পাট বেচাকেনার অন্যতম বড় কেন্দ্র ছিল। মানিকগঞ্জ ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখানে পাট নিয়ে আসতেন। প্রতি বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। এখান থেকে পাট কিনে নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাটকলে সরবরাহ করেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
হাটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রতি বুধবার ঘিওরে হাট বসছে। একসময় হাটের পাশেই ছিল ছোটখাটো নদীবন্দর। মানিকগঞ্জ ছাড়াও ফরিদপুর, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, ঢাকা ও পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় নৌকায় পাট নিয়ে আসতেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। নৌকাভর্তি পাটের পাশাপাশি হাটের আশপাশের মাঠেও জমা হতো পাটের স্তূপ। সময়ের পরিবর্তনে যোগাযোগব্যবস্থা ও বাজারের ধরন বদলেছে। বিভিন্ন এলাকায় নতুন হাটবাজার গড়ে ওঠায় ঘিওর হাটে পাটের সরবরাহ কমেছে।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর মানিকগঞ্জ জেলায় ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২৫০ হেক্টর বেশি। এ বছর জেলায় পাট উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন।
হাটে পাট বিক্রি করতে আসা কৃষকেরা জানান, পাটের ভালো দাম পেলেও উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাঁদের। বিশেষ করে পাট পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় এবং বর্ষার পানি পর্যাপ্ত না থাকায় পাট পচাতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এতে অনেক পাটের রং সোনালি হয়নি। অথচ সোনালি রঙের উন্নত মানের পাটের দাম বাজারে তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও হাটে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। পাশাপাশি নদীভাঙনে হাটের জায়গাও দিন দিন কমে আসছে।
পাইকারি ব্যবসায়ী অসীম রায় বলেন, এ অঞ্চলে মূলত তোষা ও সাদা জাতের পাটের আবাদ বেশি হয়। গত হাটে প্রায় ৮০ টন পাট কেনাবেচা হয়েছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাটের দাম ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকা। এবার কৃষকেরা পাটের ভালো দাম পাচ্ছেন। গত বছর ভালো মানের পাটের সর্বোচ্চ দাম ছিল প্রতি মণ ৪ হাজার ৫০০ টাকা। তাঁদের পরিবার তিন পুরুষ ধরে পাটের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।ব্যবসায়ী উত্তম আইচ বলেন, তাঁর বাবা পাটের ব্যবসা করতেন। ১৯৮৬ সাল থেকে তিনিও এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। একসময় নৌকায় করে ৭০০ থেকে এক হাজার মণ পাট কেনা হতো। এখন পাটের আবাদ কমে যাওয়ায় আগের মতো পাট পাওয়া যায় না। এরপরও প্রতি বুধবার ঘিওর হাটে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মণ পাট ওঠে।টাঙ্গাইলের নাগরপুর এলাকার কৃষক লাল চান বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই তিনি ঘিওর হাটে ধান, পাট ও সরিষা বিক্রি করতে আসছেন। বর্ষাকালে কয়েকজন কৃষক মিলে নৌকায় করে পণ্য নিয়ে হাটে আসেন। এতে যাতায়াত খরচ কমে, পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ঝামেলাও কম হয়।
দৌলতপুর উপজেলার বাচামারা গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন, এবার ছয় বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছিলেন। তবে পাটের মান তেমন ভালো হয়নি। মাসখানেক আগে এই হাটে প্রতি মণ ৩ হাজার ৭০০ টাকায় পাট বিক্রি করেছিলেন। এবার ১০ মণ পাট নিয়ে এসে প্রথমে প্রতি মণ ৫ হাজার টাকা দাম চাইলেও ব্যাপারীরা ৪ হাজার ৭০০ টাকার বেশি দিতে চাননি। শেষ পর্যন্ত ওই দামেই পাট বিক্রি করেছেন।একই উপজেলার চরকাটারি গ্রামের কৃষক নূর ইসলাম বলেন, আগে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় বড় নৌকাভর্তি পাট নিয়ে ব্যবসায়ীরা ঘিওর হাটে আসতেন। নৌকাভর্তি পাট কেনাবেচা হতো। হাটের পাশের কলেজ মাঠেও পাটের বড় বড় স্তূপ দেখা যেত। এখন আর আগের মতো সেই দৃশ্য নেই। বিভিন্ন জায়গায় নতুন নতুন হাটবাজার গড়ে ওঠায় এখানে পাটের আমদানি কমেছে। তারপরও আশপাশের অন্য হাটের তুলনায় ঘিওরেই এখনো বেশি পাট ওঠে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শাহজাহান সিরাজ বলেন, চলতি বছর মানিকগঞ্জে পাটের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে। অনুকূল পরিবেশ, উন্নত জাতের পাটবীজ এবং সরকারি অনুদানের কারণে কৃষকেরা পাট চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি বুধবার কোটি টাকার পাটের বেচাকেনার মধ্য দিয়ে এখনো নিজের গুরুত্ব ধরে রেখেছে ঘিওর হাট। তবে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে পাটের সরবরাহ বাড়ানো, কৃষকদের উৎপাদন ও পাট পচানোর সমস্যা সমাধান এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সময়মতো এসব সমস্যার সমাধান না হলে একসময় জৌলুস হারানো এই ঐতিহ্যবাহী হাটের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে।