শুক্রবার, এপ্রিল ২৪, ২০২৬
spot_img

ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে মার্কিন বাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইরানে স্থল অভিযান চালানো হলে মার্কিন বাহিনী শুধু বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মুখোমুখি হবে না, বরং একটি সুসংগঠিত ও বিপুলসংখ্যক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সম্মুখীন হবে—যারা মাতৃভূমি রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখে। গত চার দশকে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে এই প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছে ইরান

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখলের নির্দেশ দেন, তবে তা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক সামরিক অভিযান। এতে মার্কিন বাহিনীকে ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে—যা সামরিকভাবে অত্যন্ত জটিল।অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস মন্তব্য করেছেন, এমন অভিযানে “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশেষ বাহিনীর অপারেশন” প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যা সহজে পৌঁছানো বা দখল করা কঠিন।বিশ্লেষণে বলা হয়, পারস্য উপসাগরের মার্কিন ঘাঁটি বা বিমানবাহী জাহাজ থেকে এসব স্থাপনার দূরত্ব প্রায় ৬০০ মাইল, যা সরবরাহ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় বাধা। পাশাপাশি পশ্চিম ইরানজুড়ে বিস্তৃত জাগ্রোস পর্বতমালা প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করে।ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশল বহুস্তরভিত্তিক। দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংসের চেষ্টা করে। মাঝারি স্তরে মোবাইল ইউনিট রয়েছে, যা ড্রোন, যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ মিসাইল প্রতিহত করে। এছাড়া পোর্টেবল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও নিম্ন-উচ্চতার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে সক্ষম।

এই প্রতিরক্ষার নেতৃত্বে রয়েছে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কৌশল তৈরি করে আসছে। এই কৌশলের ভিত্তি তৈরি হয়েছে ইরান-ইরাক যুদ্ধ-এর অভিজ্ঞতা থেকে।ইরান দাবি করেছে, তাদের প্রায় ১০ লাখ যোদ্ধা প্রস্তুত রয়েছে—যার মধ্যে আইআরজিসি, বাসিজ মিলিশিয়া ও স্বেচ্ছাসেবকরা অন্তর্ভুক্ত। যদিও এই বাহিনীর প্রকৃত সক্ষমতা পুরোপুরি যাচাইযোগ্য নয়, তবুও সংখ্যার বিচারে এটি যে কোনো দখলদার বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসহাক জাহাঙ্গিরি সতর্ক করে বলেছেন, স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ভুল হবে। তার ভাষায়, ইরানের এক ইঞ্চি জমি দখল করতেও “রক্তের সাগর” পাড়ি দিতে হবে।অভিযানের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ। প্রায় ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহন করতে বিশেষ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এগুলো বিভিন্ন স্থানে ও ভিন্ন আকারে ছড়িয়ে রয়েছে—গ্যাস, ধাতব বা পাউডার আকারে, এমনকি ধ্বংসস্তূপের নিচেও থাকতে পারে।

এদিকে, ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালে তা আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি, উপসাগরীয় অবকাঠামো এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।ইতিহাসে এর কাছাকাছি উদাহরণ হিসেবে ১৯৮০ সালের একটি ব্যর্থ মার্কিন উদ্ধার অভিযানের কথা উল্লেখ করা হয়—যেখানে তেহরানে জিম্মিদের উদ্ধারে গিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে।সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য এই সংঘাত অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত। সামরিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতায়, এমন লড়াইয়ে আপাতত ইরানই তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত