
পাহাড়, হ্রদ আর মেঘের উপত্যকা রাঙামাটিতে দীর্ঘ ১ বছর ৯ মাস ৯ দিনের—মোট ৬৪৯ দিনের—দায়িত্বের অধ্যায় শেষ করে বিদায় নিয়েছেন তরুণ নেতা মো. হাবীব আজম।রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে দায়িত্ব পালনের এই সময়টুকু তাঁর জন্য যেমন ছিল প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজের অভিজ্ঞতার অধ্যায়, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছে ছিল মানবিক নানা উদ্যোগের সময়। দায়িত্বের বাইরে মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, দুর্যোগে ছুটে যাওয়া, অসহায় মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা করা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়ভাবে তাঁর একটি মানবিক পরিচিতি তৈরি হয়েছে।জেলা পরিষদের সদস্য হওয়ার আগে থেকেই দীর্ঘদিন ধরে রাঙামাটির বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন হাবীব আজম। আগুন, পাহাড়ধস, বন্যা কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণে সহায়তামানিকছড়ির এক অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর অর্থাভাবে অনিশ্চয়তায় পড়লে হাবীব আজম তাঁর ভর্তির প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা করেন। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকেও তাঁর সহযোগিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।শুধু ভর্তি সহায়তা নয়, ভবিষ্যতেও ওই শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।চিকিৎসায় অসহায় মানুষের পাশেঅর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে না পারা অসহায় মানুষের পাশেও বিভিন্ন সময়ে দাঁড়িয়েছেন হাবীব আজম। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোকেয়া বেগমের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘটনাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।মানুষের অসুস্থতার খবর পেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টরা জানান।
শীতের রাতে ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের কাছে গিয়ে শীতবস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের তালিকায়। বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশু থেকে শুরু করে ফুটপাত ও খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের মাঝেও শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন তিনি।রাঙামাটির সামাজিক বাস্তবতায় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থার গুরুত্ব রয়েছে। হাবীব আজমের সামাজিক কর্মকাণ্ডে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনে পাশে থাকার কারণে তাঁর সামাজিক যোগাযোগও বিস্তৃত হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।মানবিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে রাঙামাটির বনরূপায় নিজস্ব অর্থায়নে ‘পার্বত্য জ্ঞান অন্বেষণ পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন হাবীব আজম।পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে তরুণদের জানার সুযোগ তৈরি এবং বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।মহান স্বাধীনতা দিবসে রাঙামাটি স্টেডিয়ামে আগত শিশুদের মাঝে জাতীয় পতাকা, মাথায় পরার ফিতা ও বেলুন বিতরণের উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি।শিশুদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরির চেষ্টা করেছেন হাবীব আজম।যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই—এমন বিশ্বাস থেকে বিভিন্ন ক্রীড়া ক্লাব ও তরুণদের উৎসাহিত করেছেন তিনি।বিভিন্ন ক্রীড়া ক্লাবকে জার্সি ও ক্রীড়া সামগ্রী দেওয়া, খেলাধুলার আয়োজনকে উৎসাহিত করা এবং তরুণদের মাঠমুখী করার উদ্যোগ তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশ।রাঙামাটির অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা পরিষদে দায়িত্ব পালনকালে পর্যটন খাতের উন্নয়নেও উদ্যোগী ছিলেন হাবীব আজম।প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, পর্যটন করপোরেশন ও নার্সিং ইনস্টিটিউট সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পাওয়ার পর পর্যটনকেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন, ওয়াশরুম নির্মাণ, পর্যটকদের চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন নতুন পর্যটন আকর্ষণ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।
পর্যটন খাতে স্থানীয় তরুণদের দক্ষ করে তুলতে জেলা পরিষদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘ট্যুর গাইড প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও তাঁর দায়িত্বকালীন কর্মকাণ্ডের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে মো. হাবীব আজম ১৯৯১ সালের ১ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরের কাঁঠালতলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মো. চাঁন মিয়া এবং মা ফাতেমা বেগম।তিনি চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষে তাঁর আইন বিষয়ে শিক্ষাজীবনের এই অধ্যায় সম্পন্ন হয়।হাবীব আজম পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের (পিসিসিপি) সাবেক রাঙামাটি জেলা সভাপতি এবং বর্তমানে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।এ ছাড়া বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও FPAB-এর আজীবন সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। ‘হিল ট্রেকার্স’, ‘হিলফুল যুব সংগঠন’ ও ‘হিল সার্ভিস’-এর উপদেষ্টা হিসেবেও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন তিনি।পদ থেকে বিদায়, মানুষের কাছ থেকে নয়একজন জনপ্রতিনিধি বা পরিষদ সদস্যের দায়িত্বের মেয়াদ নির্দিষ্ট হতে পারে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই।রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে হাবীব আজমের ৬৪৯ দিনের দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হয়েছে। দায়িত্বের চেয়ার বদলেছে, দাপ্তরিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে; তবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে পথচলা, তা অব্যাহত থাকবে বলেই প্রত্যাশা তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের।পাহাড় ও হ্রদের শহর রাঙামাটিতে তাঁর রেখে যাওয়া পদচিহ্ন শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়। তা ছড়িয়ে আছে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া সহায়তায়, কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণের সহযোগিতায়, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায়, শীতার্ত মানুষের গায়ে জড়ানো শীতবস্ত্রে, শিশুর হাতে তুলে দেওয়া জাতীয় পতাকায়, তরুণের হাতে দেওয়া ক্রীড়া সামগ্রীতে কিংবা পাঠাগারের নীরব বইয়ের পাতায়।
জেলা পরিষদ থেকে তাঁর বিদায় হয়েছে—মানুষের কাছ থেকে নয়। দায়িত্বের একটি অধ্যায় শেষ হলেও জনকল্যাণের পথচলা থেমে যাওয়ার নয়।রাঙামাটির পাহাড়, হ্রদ আর মানুষের হৃদয়ে হাবীব আজমের ৬৪৯ দিনের দায়িত্বের স্মৃতি হয়তো সময়ের সঙ্গে আরও দূরে সরে যাবে। তবে মানুষের জন্য করা ভালো কাজগুলো থেকে যাবে মানুষের স্মৃতিতে।


