সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
spot_img

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, সেপ্টেম্বরে ১২ মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামে ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ২১ দিনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৫৫৩ জন এবং মারা গেছেন ১২ জন। অথচ বছরের প্রথম আট মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ৫ জনের।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৭ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর তালিকায় নারীর সংখ্যা বেশি। এ পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যুর মধ্যে ৮ জনই নারী। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ১২৬ জন ভর্তি হয়েছেন। তবে এ সময়ে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১১০ জন।

সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত-মৃত্যুতে রেকর্ড

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, আগস্টে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ হাজার ২০২ জন, জুলাইয়ে ৫৩৬ জন এবং জুনে ১২২ জন। জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৪ জন।এর আগে মে মাসে ৩৭ জন, এপ্রিলে ২৯ জন এবং মার্চে ২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। এ তিন মাসে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যু হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে আক্রান্ত হন ২২ জন এবং মারা যান একজন। জানুয়ারিতে আক্রান্ত হন ৬৮ জন।

নগরের চেয়ে উপজেলায় মৃত্যু বেশি

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা নগর ও উপজেলায় প্রায় কাছাকাছি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে উপজেলায় সংখ্যা বেশি। এখন পর্যন্ত ১৭ জনের মধ্যে নগর এলাকায় মারা গেছেন ৭ জন, বিভিন্ন উপজেলায় ৯ জন এবং অন্য জেলার একজন রোগী মারা গেছেন। চলতি বছরের আক্রান্তদের মধ্যে মহানগরে ১ হাজার ৫২৪ জন, উপজেলায় ১ হাজার ৫৩১ জন এবং অন্যান্য জেলার ৪০৮ জন রয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৭৩২ জন, নারী ৯৭১ জন এবং শিশু ৭৬০ জন।

সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ, সন্দ্বীপে সর্বনিম্ন

চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৫৩১ জন। এর মধ্যে সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ ৪৬০ জন এবং কর্ণফুলীতে ২২০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া বাঁশখালীতে ১১৪ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ১১৩, আনোয়ারায় ৮১, রাউজানে ৭৯, সাতকানিয়ায় ৭৪, পটিয়ায় ৭৩, মিরসরাইয়ে ৫৭, লোহাগাড়ায় ৫৬, বোয়ালখালীতে ৫৬, হাটহাজারীতে ৫২, চন্দনাইশে ৪৫, ফটিকছড়িতে ৩৪ এবং সন্দ্বীপে ১৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।

থেমে থেমে বৃষ্টিতে বাড়ছে এডিসের প্রজনন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রজনন মৌসুম। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। ফলে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটিই বেড়েছে। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুবাহী মশার প্রকোপ বেড়েছে। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হয়।

তিনি জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগকে সতর্ক রাখার পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসায় ওষুধ ও মশারির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সিভিল সার্জন আরও বলেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো জরুরি। ডেঙ্গু শনাক্ত হলে পর্যাপ্ত পানি পান ও বিশ্রামের পাশাপাশি মশারির ভেতরে থাকার পরামর্শ দেন তিনি। পেটে ব্যথা, বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতাসহ জটিল উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

নগরে চসিকের ক্রাশ প্রোগ্রাম

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম (মাহি) জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। স্পেশাল টিমের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক ছোট দলগুলোও কাজ করছে। চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে বিশেষ তদারকি, মোবাইল কোর্ট ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এডিস মশার প্রজনন বাড়ে। এডিস মশার ডিম শুকনো অবস্থায় দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। বৃষ্টির পর পানির সংস্পর্শে এলে এসব ডিম থেকে নতুন করে মশার বিস্তার ঘটতে পারে।

আগের বছরগুলোর তুলনায় পরিস্থিতি

চট্টগ্রামে ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা যান ২৭ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩২৩ জন, মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মারা যান ১০৭ জন। ২০২২ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৪৪৫ জন, মৃত্যু হয় ৪১ জনের। আর ২০২১ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২৭১ জন এবং মারা যান ৫ জন।

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত