বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬

১৭৬২ সালের ভূমিকম্পে বদলে যায় চট্টগ্রামের ভূগোল, সেই ইতিহাসেই খাতুনগঞ্জের উত্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল। বিকেল প্রায় পাঁচটা। ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল চট্টগ্রাম। প্রায় চার মিনিট স্থায়ী ওই ভূমিকম্পে কামানের গর্জনের মতো ১৫টি বিকট শব্দ শোনা যায়। কোথাও ভূমি উঁচু হয়ে যায়, কোথাও আবার ধসে পড়ে। বদলে যায় চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি, পরিবর্তিত হয় কর্ণফুলী নদীর গতিপথ। আর সেই বদলে যাওয়া ভূগোলের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ আশপাশের বাণিজ্যিক জনপদ।১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের বিবরণ তৎকালীন ইসলামাবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যক্রমের প্রধান হ্যারি ভেরেলস্ট ফোর্ট উইলিয়ামের প্রেসিডেন্ট ও গভর্নর হেনরি ভ্যানসিটার্টের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফারসি থেকে অনূদিত সেই বিবরণ ১৭৬৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর রয়্যাল সোসাইটির ফিলোসফিক্যাল ট্রানজেকশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

চট্টগ্রামের নদী, খাল ও জনপদের পরিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের উত্থান। চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ ও কোরবানিগঞ্জ মিলিয়ে গড়ে ওঠা এ বাণিজ্যিক অঞ্চলে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, গম ও মসলাসহ নানা পণ্যের বড় অংশের বেচাকেনা হয়।একসময় চাক্তাই খাল ছিল পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ খাল থেকে কর্ণফুলী নদী ও চানখালী খাল হয়ে সাঙ্গু নদীর মাধ্যমে বান্দরবানের থানচি ও রুমা পর্যন্ত নৌযানে পণ্য পরিবহন করা হতো। ১৮১৮ সালে স্কটিশ জেনারেল জন চিপের আঁকা মানচিত্রে চট্টগ্রামের তিনটি বড় খালের একটি হিসেবে চাক্তাইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে খালটির নাম লেখা হয়েছিল ‘চাক্তাই নুল্লা’ বা ‘নাল্লা’।ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন চট্টগ্রাম শহরের বসতি গড়ে উঠেছিল চাক্তাই খালের পশ্চিম তীরে। পূর্ব তীরের বড় একটি অংশ ছিল চরাঞ্চল। ১৭৬২ সালের ভূমিকম্প এবং পরবর্তী সময়ে পলি জমার কারণে কর্ণফুলী ও আশপাশের ভূপ্রকৃতিতে পরিবর্তন আসে। তবে ভূমিকম্পের ফলে ঠিক কোন এলাকায় কতটুকু ভূমি জেগে উঠেছিল, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

গবেষক হারুন রশীদ তাঁর ‘চিৎ-তৌৎ-গং’ গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ভূমিকম্পের পর খালের পূর্ব অংশ জেগে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে পলি জমে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও বাকলিয়া এলাকার ভূখণ্ড গড়ে ওঠে।খাতুনগঞ্জের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হামিদুল্লাহ খান বাহাদুরের নাম। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংরেজ কর্মচারী খান বাহাদুর শেখ মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ খান বর্তমান খাতুনগঞ্জের কাছাকাছি এলাকায় একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। বাজারটি পরিচিতি পায় ‘হামিদুল্লাহ মিঞার বাজার’ নামে।চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরীর ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, হামিদুল্লাহ খানের দ্বিতীয় স্ত্রী খাতুন বিবির নিজস্ব জমি ছিল ওই বাজারের পাশে। সময়ের সঙ্গে সেখানে দোকানপাট গড়ে ওঠে। বেচাকেনা বাড়ার পর এলাকাটি খাতুন বিবির নামেই পরিচিতি পেতে শুরু করে। একপর্যায়ে নাম হয় খাতুনগঞ্জ।

চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে খাতুনগঞ্জও বড় হতে থাকে। নদীপথে আসা পণ্য আশপাশের ঘাটে নামানো হতো। পরে সড়কপথেও পণ্য পরিবহন বাড়ে। গড়ে ওঠে গুদাম, আড়ত ও পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পণ্য কিনে নিয়ে যেতে শুরু করেন।ইংরেজ আমল পেরিয়ে পাকিস্তান আমলেও খাতুনগঞ্জ ছিল পণ্য বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ আসে বাঙালি ব্যবসায়ীদের হাতে। গত শতকের শেষ ভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, গম, ডাল ও মসলার বেচাকেনায় জমজমাট ছিল এ বাজার।২০০২-০৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া চাল, ডাল, গম, সয়াবিন তেল, পাম তেল ও চিনির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ টন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আমদানি করেছিলেন প্রায় ১২ লাখ টন, যা মোট আমদানির ৬২ শতাংশ। এসব পণ্যের বড় অংশের বেচাকেনা হতো খাতুনগঞ্জে।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বাজারের চিত্র। বড় বড় স্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও মোড়কজাতকরণের বড় অংশ চলে গেছে ঢাকাভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। আগে খোলা পণ্যের যে বাণিজ্য ছিল, তার একটি বড় অংশ এখন কারখানায় মোড়কজাত হয়ে বাজারে আসছে।খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিঞা বাজারের প্রায় ৭৫ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠান মেসার্স বাচা মিয়া সওদাগরের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইদ্রিসের ভাষ্য, নব্বইয়ের দশকের আগপর্যন্ত দেশের নিত্যপণ্যের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল খাতুনগঞ্জ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা এখানে এসে পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। দিনরাত চলত বেচাকেনা। তবে সেই ব্যস্ততা এখন অনেকটাই কমে গেছে।বর্তমানে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমদানি ও পাইকারি বাণিজ্যে আগের অবস্থান ধরে রাখা। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য আমদানি হলেও সেগুলোর একটি অংশ অন্য অঞ্চলে নিয়ে মোড়কজাত করে আবার বাজারে আনা হচ্ছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ কমছে, বাড়ছে পরিবহন ব্যয়ও।

তবে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে খাতুনগঞ্জের গুরুত্ব এখনো রয়েছে। কোনো পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি ও বাজারদর সম্পর্কে ধারণা পেতে ব্যবসায়ীদের এখনো এ বাজারের খোঁজ নিতে হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিযোগিতাও কমেছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারের ওপর।চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজধানীমুখী হওয়ায় আমদানি ও পাইকারি বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা কমেছে। ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধান করে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে খাতুনগঞ্জের পুরোনো জৌলুস ফিরিয়ে আনা সম্ভব।একসময় নদীপথ, ঘাট ও আড়তকে কেন্দ্র করে যে বাজারের উত্থান, সময়ের পরিবর্তনে সেই বাজারের বাণিজ্যিক চরিত্রও বদলে গেছে। ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পে বদলে যাওয়া চট্টগ্রামের ভূগোলের সঙ্গে যে জনপদের ইতিহাস জড়িয়ে, সেই খাতুনগঞ্জ এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়।

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত