
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ‘শাহ আরেফিন (রহ.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতু’ নিয়ে দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষা। আড়াই বছরে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও আট বছরেও শেষ হয়নি সেতুটির কাজ। এরই মধ্যে একাধিকবার কাজ শেষ করার সময়সীমা দেওয়া হলেও তা পূরণ হয়নি। সর্বশেষ এখন বলা হচ্ছে, বাকি কাজ শেষ করতে আরও দুই বছর সময় লাগতে পারে। নতুন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন।
২০১৮ সালের মার্চে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৭৫০ মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ শেষ হলে এটি হবে সুনামগঞ্জ জেলার দীর্ঘতম সেতু। সেতুর এক প্রান্তে রয়েছে বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি এবং অপর প্রান্তে বিন্নাকুলী গ্রাম। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৫ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। নির্মাণকাজ শেষ করার সময়সীমা ছিল ৩০ মাস। সে হিসাবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরেই সেতুটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সেতুটির নির্মাণকাজ করছিল তমা কনস্ট্রাকশন। এরই মধ্যে ১৫টি পিলারের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে ৫৩টি এবং ১৫টি স্ল্যাবের মধ্যে ১০টির কাজ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ সেতুর প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি।
সবশেষ গত ১৯ মে রাতে নির্মাণকাজ চলার সময় সেতুর পাঁচটি গার্ডার নদীতে ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। পরে পুরোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এলজিইডি। এলজিইডি সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, বাকি কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। চলতি মাসেই দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু করা হবে। বাকি কাজ শেষ করতে আরও প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এ নিয়ে তৈরি হয়েছে হতাশা। তাঁদের অভিযোগ, নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজে ধীরগতি ছিল। করোনা, বন্যা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও যোগাযোগ সমস্যাসহ নানা কারণ দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এলজিইডির পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকর্মী অমিয় হাসান বলেন, সামনে জুন করতে করতে আট বছর পার হয়ে গেছে। এখন আবার বলা হচ্ছে আরও দুই বছর লাগবে। এই দুই বছরেও কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়েও তাঁদের সন্দেহ রয়েছে। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, সেতুর কাজে ধীরগতি ও গাফিলতির প্রতিবাদে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে। সেতুটি নির্মাণ হলে মধ্যনগর হয়ে নেত্রকোনা ও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। ইতিমধ্যে মধ্যনগরের মহিষখলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় মানুষের ভোগান্তি থেকে যাচ্ছে। এলাকাবাসীর জন্য সেতুটির গুরুত্ব শুধু যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যাদুকাটা নদীর তীরে শাহ আরেফিন (রহ.)-এর আস্তানা এবং শ্রীশ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর জন্মস্থান রয়েছে। কাছেই রয়েছে সীমান্ত হাট। নদীর পশ্চিম তীরে দেশের অন্যতম বড় শিমুলবাগান, বারিক টিলা, টাঙ্গুয়ার হাওর, লাকমাছড়া, শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রি লেক) ও টেকেরঘাটের মতো পর্যটনকেন্দ্র।
সীমান্ত এলাকায় বগছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী শুল্কস্টেশন থাকায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষেরও নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। সেতুটি চালু হলে বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার মানুষের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটনেও গতি আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিন্নাকুলী গ্রামের বাসিন্দা তানভীর আহমদ বলেন, তাহিরপুর সীমান্ত এলাকায় মানুষের যাতায়াত দিন দিন বাড়ছে। যাদুকাটা নদী পারাপারের সময় প্রায় প্রতিবছর দুর্ঘটনা ঘটে এবং প্রাণহানিও হয়। সেতুটি চালু হলে তিন উপজেলার মানুষ উপকৃত হবেন। কিন্তু আট বছরেও কাজ শেষ না হওয়ায় তাঁরা হতাশ।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, একটি সেতুর জন্য এলাকাবাসী আর কত দিন অপেক্ষা করবে? নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন স্থানীয়দের অপেক্ষা—নতুন ঠিকাদার নিয়োগের পর সত্যিই কি গতি ফিরবে সেতুর নির্মাণকাজে, নাকি ‘আগামী জুন’ শেষ হওয়ার প্রতিশ্রুতির মতো ২০২৮ সালের জুনও চলে যাবে অপেক্ষার আরেক বছর হয়ে?


