
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত মুহূর্ত নতুন নয়। তবে গত সপ্তাহে এক নারী সাংবাদিককে লক্ষ্য করে অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের ঘটনায় আবারো তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে; সাংবাদিক মহল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলেও উঠেছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। যদিও এর সবটাই ‘স্বচ্ছতা ও স্পষ্টভাষিতা’ বলে ব্যাখ্যা করেছে হোয়াইট হাউজ।
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয় যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন–সম্পর্কিত তথ্য নিয়ে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ই–মেইলের মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে, এপস্টেইনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্পর্কে ট্রাম্প অবগত ছিলেন। ওই প্রসঙ্গেই সাংবাদিক প্রশ্ন করলে ক্ষেপে যান প্রেসিডেন্ট। তিনি আঙুল তুলে শাসানোর ভঙ্গিতে সাংবাদিককে বলেন—“চুপ কর, শুর বা**”** (ইংরেজিতে: Quiet, piggy )। মুহূর্তেই বিষয়টি ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং পরে ভাইরাল হলে এর নিন্দায় ফেটে পড়ে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ।ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিয়াভিট ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, আমেরিকানরা তাকে পুনর্নির্বাচিত করেছেন মূলত তার সরল, স্পষ্টভাষী অবস্থানের কারণে। সাংবাদিকেরা তার প্রশ্ন–উত্তরের প্রতি উন্মুক্ততাকে গুরুত্ব দিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। লিয়াভিট দাবি করেন, ট্রাম্প মিথ্যা খবর দেখলে তা চিহ্নিত করেন এবং ভুল তথ্য ছড়ানো সাংবাদিকদের কারণে বিরক্ত হন। তাঁর মতে, সংবাদমাধ্যমকে ট্রাম্প নজিরবিহীন প্রবেশাধিকার দেন এবং প্রায় প্রতিদিনই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন।তবে, ওই নারী সাংবাদিক কোনো ভুল তথ্য ছড়িয়েছিলেন কি না—সে বিষয়ে হোয়াইট হাউজ কিছুই জানায়নি। এ কারণেই সমালোচকদের বক্তব্য, প্রশাসন বিষয়টি আড়াল করছে এবং প্রেসিডেন্টের আচরণকে বৈধতা দিচ্ছে।
ঘটনার মাত্র কয়েকদিন পরই ওভাল অফিসে আরেক নারীর দিকে বিরূপ মন্তব্য করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র সফররত সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে সাংবাদিক জামাল খাশোগজি হত্যাকাণ্ড ও এপস্টেইন–সম্পর্কিত ফাইল প্রকাশ না করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট ঐ নারী সাংবাদিককে “এক ভয়ংকর মানুষ” বলে কটাক্ষ করেন। এতে শুধু সাংবাদিক মহল নয়, মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।এর মধ্যেই বুধবার ট্রাম্প দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এপস্টেইন তদন্ত–সংক্রান্ত নথিপত্র প্রকাশের নির্দেশ দিয়ে একটি বিল স্বাক্ষর করেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি এ ফাইল প্রকাশের অঙ্গীকার করেছিলেন, কিন্তু পরে বেশ সময়ক্ষেপণ করেন বলে সমালোচনা ছিল।
সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক সংগঠন সোসাইটি অব প্রফেশনাল জার্নালিস্টস (এসপিজি)–এর পক্ষ থেকে। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের বড় সমর্থক হবেন—এমন প্রত্যাশা কেউ করে না; তবে সাংবাদিকদের বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের উদ্দেশে অপমানজনক ভাষা ব্যবহার একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ক্যারোলিন হেনড্রি বলেন, ট্রাম্পের এমন আচরণ নতুন নয় এবং নারীদের হেয় করার ভাষা ব্যবহারের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তার।
সমালোচকদের মতে, এই ধরনের মন্তব্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের জন্য গুরুতর হুমকি। অন্যদিকে, ট্রাম্প সমর্থকরা বিষয়টিকে তার “সরাসরি কথা বলার স্টাইল” হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকেন।একাধিক বিতর্ক সত্ত্বেও হোয়াইট হাউজ এখনো পর্যন্ত “পিগি” মন্তব্য নিয়ে নতুন কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বরং, প্রশাসনের অবস্থান—ট্রাম্প শুধু “ভুল খবর” মোকাবিলা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী বছর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের ভাষা ও আচরণ আরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। আর সাংবাদিকদের প্রতি তার ব্যবহার ২০২৪–এর রাজনৈতিক পরিবেশে কী প্রভাব ফেলবে—তা নিয়েই এখন সবচেয়ে তীব্র আলোচনা।


