সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬
spot_img

সেন্টমার্টিনে পর্যটক ভ্রমণ বন্ধ: টানা ৯ মাস জীবিকার অনিশ্চয়তায় দ্বীপবাসী

কক্সবাজার প্রতিনিধি

কক্সবাজারের টেকনাফের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) থেকে কোনো পর্যটক যেতে পারবেন না। একই সঙ্গে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলও বন্ধ থাকছে। পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর মধ্য দিয়ে টানা নয় মাস পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দ্বীপের বাসিন্দারা নতুন করে জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।শনিবার (৩১ জানুয়ারি) চলতি মৌসুমের শেষ দিনে শেষবারের মতো পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনে যাতায়াত করবে। এরপর নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত দ্বীপে কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। এতে দ্বীপের পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী ও পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।সাধারণত প্রতি বছর ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটক ভ্রমণের অনুমতি থাকলেও এবার সময়সীমা কমিয়ে নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। নভেম্বর মাসে পর্যটকদের রাতযাপনও নিষিদ্ধ ছিল।

মৌসুম ছোট হওয়ায় আয় হয়নি

দ্বীপের বাসিন্দারা জানান, সময়সীমা কমিয়ে দেওয়ায় ভরা পর্যটন মৌসুমেও তারা প্রত্যাশিত আয় করতে পারেননি। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার পর্যটক করে চলতি মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করেছেন। তবে তাতেও পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা আশানুরূপ আয় করতে পারেননি।কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইন বলেন, “শনিবার সব পর্যটক নিয়ে জাহাজ চলাচল করবে। রবিবার থেকে কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। সরকার পরবর্তী সময়ে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

লোকসানের মুখে ব্যবসায়ীরা

সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহমান বলেন, “অনেক ব্যবসায়ী সময়মতো বিনিয়োগের টাকা তুলতেই পারেননি। অধিকাংশই লাভের বদলে লোকসানে পড়েছেন। নির্বাচন শেষে যদি আবার পর্যটন চালু করা হয়, তাহলে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”কটেজ ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “এবার আমাদের কোনো আয় হয়নি। জাহাজ কর্তৃপক্ষ ও কিছু বহিরাগত বিনিয়োগকারীর সিন্ডিকেটের কারণে স্থানীয়রা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন নয় মাস পর্যটক বন্ধ থাকলে দুর্দিন আরও বাড়বে।”

শ্রমজীবীদের দুর্দশা

রিকশাচালক নুর আজিম বলেন, “রিকশা কেনার জন্য ঋণ নিয়েছিলাম। দুই মাসেও সেই টাকা তুলতে পারিনি। এখন আবার মাছ ধরতে যেতে হবে। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবো।”

ব্যবসায়ীদের দাবি

দ্বীপের ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার মানুষ জড়িত। মানবিক দিক বিবেচনায় অন্তত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কিংবা আরও কয়েক মাস সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “দ্বীপের প্রায় সবাই পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ করে ভ্রমণ বন্ধ হওয়ায় সবার মধ্যে হতাশা কাজ করছে। সময়টা আরেকটু বাড়ানো গেলে আগামী নয় মাস পার করা সহজ হতো।”

কড়াকড়ি বিধিনিষেধ বহাল

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকরা শুধু দিনের বেলায় দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারবেন, রাতযাপন নিষিদ্ধ ছিল। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিত পরিসরে রাতযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। বিআইডব্লিউটিএ ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না।

এ ছাড়া সৈকতে রাতের বেলায় আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা বিক্রি, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সৈকতে মোটরসাইকেল ও মোটরচালিত যান চলাচল বন্ধ এবং একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

ভ্রমণের সুযোগ কমেছে

বঙ্গোপসাগরের বুকে আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই প্রবাল দ্বীপে তিন বছর আগেও টেকনাফ থেকে দৈনিক পাঁচ-ছয় হাজার পর্যটক যাতায়াত করতেন। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধপরিস্থিতি, নাফ নদীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অপহরণসহ নানা ঘটনায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। এতে ভ্রমণের সুযোগ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত