মঙ্গলবার, আগস্ট ১১, ২০২৬
spot_img

এক বছরেই উধাও সাড়ে ৪ হাজার ডাস্টবিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধ করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছিল আধুনিক প্লাস্টিকের ডাস্টবিন। উদ্দেশ্য ছিল নগরবাসী নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলবেন এবং এর মাধ্যমে নগর পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। তবে বছর না ঘুরতেই উধাও হয়ে গেছে প্রায় সাড়ে চার হাজার ডাস্টবিন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে ২০২৫ সালের মে মাসে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় মোট ৫ হাজার ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়। কিন্তু এক বছর পর বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র ৫০০টির মতো ডাস্টবিন পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অর্থাৎ প্রায় ৯০ শতাংশ ডাস্টবিনই এখন আর নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব ডাস্টবিন চসিক নিজস্ব অর্থায়নে কেনেনি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন ব্যাংক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অনুদান হিসেবে ডাস্টবিনগুলো চসিককে দেয়। পরে ওয়ার্ড অফিস, সাবেক কাউন্সিলর ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে সেগুলো স্থাপন করা হয়।

প্রতিটি ডাস্টবিনের ধারণক্ষমতা ছিল ২৪০ লিটার এবং বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টাকা। সে হিসাবে সাড়ে চার হাজার ডাস্টবিনের আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। চসিকের ২৫ নম্বর রামপুর ওয়ার্ডেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১০০টি ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়েছিল। ওয়ার্ডটির পরিচ্ছন্নতা সুপারভাইজার মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ডাস্টবিন বসানোর পর শুরুতে প্রায় সব জায়গাতেই সেগুলো দেখা যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে সংখ্যা কমতে থাকে। বর্তমানে অধিকাংশ জায়গায় আর ডাস্টবিন নেই।

একই চিত্র দেখা গেছে বাকলিয়া এলাকাতেও। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, এলাকার একটি ব্রিজের পাশে ছয়টি ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল। এখন একটিও নেই। তার অভিযোগ, সবগুলোই চুরি হয়ে গেছে। শুধু সাধারণ মানুষই নন, চসিকের কর্মকর্তারাও ডাস্টবিন উধাও হওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, লালখান বাজার এলাকায় বাসা থেকে অফিসে আসার পথে তিনি নিয়মিত তিনটি ডাস্টবিন দেখতে পেতেন। এখন সেগুলোর একটিও নেই।

চসিকের বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডাস্টবিনগুলোর উপকরণ ও মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে টোকাই ও ভাঙারি চোরেরা ডাস্টবিনের ঢাকনা খুলে নিয়ে যায়। পরে রাতের আঁধারে অনেক ডাস্টবিন ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নগর পরিচ্ছন্ন রাখতে ৪১টি ওয়ার্ডে ৫ হাজার ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় ৫০০টি পাওয়া যাচ্ছে। বাকি ডাস্টবিনগুলো টোকাই ও ভাঙারি চোরেরা নিয়ে গেছে বলে জানান তিনি। জনসচেতনতার অভাবের বিষয়টিও তুলে ধরেন এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষে প্রতিটি ডাস্টবিন পাহারা দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারি সম্পদকে নিজেদের সম্পদ মনে করে রক্ষা করতে হবে নগরবাসীকেই।

তিনি আরও বলেন, চসিকের জনবল অপ্রতুল। এর মধ্যে ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহ প্রকল্প বন্ধ থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ চলছে। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, শুধু চুরি বা জনসচেতনতার অভাবকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ডাস্টবিনগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন ছিল। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাঁর নিজের বাসার পাশেও একটি ডাস্টবিন ছিল, সেটিও এখন নেই। তাঁর মতে, ডাস্টবিনগুলো একদিনে উধাও হয়নি। পরিচ্ছন্নতা বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিয়মিত নজরদারি করলে এবং সময়মতো কর্তৃপক্ষকে জানালে শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো।

তিনি বলেন, ডাস্টবিনগুলো চসিকের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা না হলেও এগুলো নগরবাসীর সম্পদ। অনুদানের মাধ্যমে পাওয়া এসব ডাস্টবিনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব।

আখতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, এভাবে অনুদানে পাওয়া সম্পদ হারিয়ে গেলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নগর উন্নয়নে অনুদান দিতে আগ্রহ হারাতে পারে। তাই ডাস্টবিনগুলো কোথায় কীভাবে হারিয়ে গেল, তার কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নগরবাসীর প্রত্যাশা, হারিয়ে যাওয়া ডাস্টবিনের বিষয়ে তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং নতুন করে ডাস্টবিন স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলোর নিরাপত্তা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করবে চসিক। এতে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং পরিচ্ছন্ন চট্টগ্রাম গড়ার উদ্যোগও বাস্তব রূপ পাবে।

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত