
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জোরেশোরে প্রাক-প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে নির্বাচনের মাঠ প্রশাসন সাজাতে নেমেছে সরকার। ইতোমধ্যে দেশের ২৯ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, আরও কয়েক জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। একইভাবে পুলিশ প্রশাসনেও আসছে বড় ধরনের রদবদল—বিভিন্ন জেলায় নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে জেলা প্রশাসকরাই রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলার সার্বিক তদারকির দায়িত্বে থাকেন। এজন্য সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে চায় সরকার। চলতি মাসের মধ্যেই মাঠ প্রশাসনে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ৮ নভেম্বর থেকে ডিসি নিয়োগে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। প্রথম দফায় ১৫ জেলায় এবং পরদিন আরও ১৪ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রথম ধাপে মোট ২৯ জেলার ডিসি বদল হলেও এর মধ্যে ২১ জন নতুন মুখ। বাকিদের জেলা পরিবর্তন করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুগ্ম-সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া অনেককেই মাঠ প্রশাসন থেকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি যাদের কর্মদক্ষতা সন্তোষজনক নয় বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদেরও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।বর্তমানে ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫ জেলায় আগের ডিসিরা দায়িত্বে আছেন। এদের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন আসবে বলে জানা গেছে। একজন কর্মকর্তার ভাষায়, “প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন সাপেক্ষে তফসিল ঘোষণার আগেই বাকি জেলাগুলোর ডিসি নিয়োগ চূড়ান্ত হবে।”
অন্যদিকে, মাঠ প্রশাসনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুলিশ বিভাগেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জেলায় নতুন এসপি নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, “এসপি নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে, খুব শিগগিরই এ কার্যক্রম শুরু হবে।”স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন—এসপি ও ওসিদের পদায়ন লটারির মাধ্যমে করা হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সচিব বলেন, “প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় যেভাবে নির্দেশ দেবে, সেভাবেই হবে।”জানা গেছে, বর্তমানে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের যোগ্যতার মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে যারা সততা ও দক্ষতার দিক থেকে এগিয়ে, তাদেরই এসপি হিসেবে পদায়নের সুপারিশ করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে রদবদল আনবে মন্ত্রণালয়।সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, সঠিক কর্মকর্তা বাছাই ও দায়িত্ব বণ্টনই সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেন, “যদি যোগ্য ডিসি ও ইউএনও নিয়োগ দেওয়া যায় এবং তাদের অনুপ্রাণিত করা হয় ভালো কাজের জন্য, তাহলে এখনো একটি ভালো নির্বাচন সম্ভব।”
একই মত প্রকাশ করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া। তার মতে, “যোগ্য ও চৌকস কর্মকর্তারা মাঠে থাকলে তারা কৌশলে রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। এতে সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ তৈরি হয়। সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে, এটা ইতিবাচক।”তবে প্রশাসন বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি বিতর্ক সৃষ্টি হয় বা দলীয় পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে, তবে তা নির্বাচনের আগে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে।অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত তিনটি নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের এবারে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি সম্ভব নয়। কারণ, এমন কর্মকর্তা পাওয়া কঠিন যাদের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা নেই। তাই যাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযোগ নেই, তাদেরই রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন উভয়ই এখন মাঠ প্রশাসন পুনর্গঠনে ব্যস্ত সময় পার করছে। সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ভোটের মাঠে প্রশাসনের প্রতি আস্থা বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


