
সুনামগঞ্জ/আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে গ্রিস উপকূলে ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছেন অন্তত ১৮ বাংলাদেশি। নৌকায় টানা ছয়দিন খাবার ও পানীয় ছাড়া ভাসতে ভাসতে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা।জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। এর মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন—পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁওয়ের শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁওয়ের মো. আলী, বাউরি গ্রামের সুহানুর এবং পৌরসভার কবিরপুর গ্রামের নাঈম।এছাড়া দিরাই উপজেলার চারজন—জাহানপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৪০), তারাপাশার মো. সাহান (৩৩), সাজিদুর রহমান (২৮), নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০) এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার পানাইল গ্রামের ফাহিম (২২) নিহতদের মধ্যে রয়েছেন। একই এলাকার তারেক (২২) নামে একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এ মানবপাচারের পেছনে একটি সক্রিয় আন্তর্জাতিক দালালচক্র কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, ছাতক এলাকার দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লাল এ চক্রের মূল হোতা। বিল্লাল গ্রিসে অবস্থান করে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন, আর দেশে বসে দুলাল মিয়া যুবকদের ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায় করেন।স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমিনুর রহমান ১১ লাখ টাকার চুক্তিতে এই যাত্রা শুরু করেন। তিন দিনের মধ্যে ইউরোপে পৌঁছানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও তাকে প্রায় তিন মাস লিবিয়ার গোপন আস্তানায় আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে বড় জাহাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি ছোট প্লাস্টিক ও রাবারের বোটে তুলে দেওয়া হয়।জীবিত উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ায় নৌকাটি পথ হারিয়ে ফেলে। টানা ছয়দিন খাবার ও পানীয় ছাড়া সমুদ্রে ভাসতে থাকেন তারা। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঠান্ডা ও ক্লান্তিতে একে একে অনেকেই মারা যান। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।এদিকে গ্রিস কোস্ট গার্ড জানায়, Frontex-এর একটি জাহাজ ক্রিট দ্বীপের কাছ থেকে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানি এবং চাদের ১ জন নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন নারী ও একটি শিশুও রয়েছে।উদ্ধারপ্রাপ্তদের বরাতে জানা গেছে, নৌকাটি গত ২১ মার্চ লিবিয়ার বন্দরনগরী তোবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে। ছয়দিন সমুদ্রে ভাসতে থাকায় খাদ্য ও পানির সংকটে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে প্রবেশ ও অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে।প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অন্তত ৫৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান দ্বার হিসেবে গ্রিসে অভিবাসীদের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
এদিকে, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, দিরাই ও দোয়ারাবাজারে নিহতদের পরিবারের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এলাকাবাসী এই মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।


