
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘কাঞ্চন পেয়ারা’ এখন আর শুধু দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। অতুলনীয় স্বাদ, আকর্ষণীয় রং, সুন্দর গড়ন এবং দীর্ঘ সময় সতেজ থাকার কারণে এই পেয়ারা জায়গা করে নিয়েছে বিদেশের বাজারেও। চলতি মৌসুমে প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি কাঞ্চন পেয়ারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।মৌসুমের শুরুতেই চন্দনাইশের বিভিন্ন বাগানে পেয়ারা সংগ্রহ ও বিক্রির ব্যস্ততা বেড়েছে। জুলাই মাস থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বাজারে উঠতে শুরু করে কাঞ্চন পেয়ারা।
বর্তমানে ভোর থেকেই বাগানে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। বাগান থেকে সংগ্রহ করা পেয়ারা যাচ্ছে পাইকারদের হাতে, সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চন্দনাইশের উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এখানকার পেয়ারা স্বাদ ও গুণগত মানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে পরিচিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করছেন।
পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে কাঞ্চন পেয়ারা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে চন্দনাইশের অবস্থান হওয়ায় দ্রুত পরিবহন সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে বাগান থেকে সংগ্রহের পর অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন বাজার ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় পেয়ারা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।চন্দনাইশের হাশিমপুর, কাঞ্চননগর, ধোপাছড়ি, দোহাজারী ও জামিজুরীসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ও সমতল এলাকায় ব্যাপকভাবে পেয়ারা চাষ হচ্ছে। পাশের উপজেলা পটিয়ার পাহাড়ি এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে এই চাষ। প্রতিদিন ভোর থেকে স্থানীয় বাজার ও বাগানগুলোতে পেয়ারা কেনাবেচা শুরু হয়। পরে ট্রাক ও পিকআপে করে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়।
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলার হাশিমপুর, জঙ্গল হাশিমপুর, ছৈয়দাবাদ, লট এলাহাবাদ, দোহাজারী ও ধোপাছড়ি এলাকার পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ৭২০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা বাগান রয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ১১ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগের তুলনায় এবার কাঞ্চন পেয়ারার সামগ্রিক উৎপাদন কিছুটা কমেছে।চাষিরা বলছেন, অন্যান্য অনেক ফলের তুলনায় কাঞ্চন পেয়ারা উৎপাদনে খরচ তুলনামূলক কম। কিন্তু বাজারে এর চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় চাষ করে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে প্রতিবছরই নতুন নতুন কৃষক পেয়ারার চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বহু পরিবার এখন সরাসরি পেয়ারা চাষ ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল।
পেয়ারাচাষি মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, অন্যান্য ফলের তুলনায় কাঞ্চন পেয়ারার উৎপাদন ব্যয় কম হলেও বাজারমূল্য ভালো পাওয়া যায়। সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে ফলনও ভালো হয়।পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম মিয়ার ভাষ্য, স্বাদ ও মানের কারণে ক্রেতাদের কাছে কাঞ্চন পেয়ারার চাহিদা অনেক বেশি। বাজারে আনার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিক্রি হয়ে যায়।তবে বিদেশের বাজারে চাহিদা বাড়লেও কাঞ্চন পেয়ারা রপ্তানিতে এখনো রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও কোল্ড চেইন অবকাঠামোর অভাবে সম্ভাবনা অনুযায়ী রপ্তানি বাড়ানো যাচ্ছে না।
ফল ও সবজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ফুডস অ্যান্ড ভেজিটেবলসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী হানিফ জানান, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে কাঞ্চন পেয়ারা বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার কাঞ্চন পেয়ারা ও অন্যান্য জাতের পেয়ারা রপ্তানি হয়ে থাকে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক মানের ফল ও সবজি ‘প্যাকিং হাউস’ নির্মাণ করা গেলে কাঞ্চন পেয়ারা রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও কোল্ড চেইন সুবিধা গড়ে তোলা হলে কৃষক ও রপ্তানিকারক উভয়েই লাভবান হবেন।
অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়লে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও কৃষকের আয়ও বাড়বে। আধুনিক চাষাবাদ, মানসম্মত প্যাকেজিং এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে চন্দনাইশকে কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি সম্ভাবনাময় হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা মনে করেন, কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আধুনিক প্রযুক্তি ও রপ্তানি অবকাঠামোর উন্নয়ন করা গেলে চন্দনাইশের কাঞ্চন পেয়ারা দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আজাদ হোসেন জানান, এই অঞ্চলের পেয়ারা ইতোমধ্যে আলাদা সুনাম অর্জন করেছে। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।সব মিলিয়ে, চন্দনাইশের কাঞ্চন পেয়ারা এখন স্থানীয় কৃষকের আয়ের অন্যতম উৎস হওয়ার পাশাপাশি দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী ফল ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে।


