
রাজধানীর শ্যামলী স্কয়ার শপিং মলের একটি গয়নার দোকানের ফেসবুক পেজে মাত্র ৪ হাজার ৯৯৯ টাকায় ‘ডায়মন্ড’ নাকফুল বিক্রির বিজ্ঞাপন ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো আসল হীরা, নাকি ল্যাবে তৈরি বিকল্প পাথর?বিজ্ঞাপনে প্রতিটি নাকফুলে বিশেষ ছাড়ের পাশাপাশি আকর্ষণীয় উপহারের কথাও বলা হয়েছে। এক ক্রেতা কমেন্টে পণ্যটি আসল কি না জানতে চাইলে বিক্রেতা দাবি করে, তাদের হীরা ১০০ শতাংশ প্রাকৃতিক এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বৈধভাবে সংগ্রহ করা।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে হীরার খনি নেই, দেশেও হীরা উৎপাদিত হয় না। অন্যদিকে গত কয়েক বছর ধরে বৈধ পথে হীরা আমদানির পরিমাণও অত্যন্ত কম। অথচ ব্যবসায়ীদের হিসাবে দেশে হীরার বাজারের আকার প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) আগের তথ্যেও এই বাজারকে মূলত চোরাচালাননির্ভর বলে দাবি করা হয়েছে।
বৈধ আমদানি কম, বাজারে হীরার ছড়াছড়ি
খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, বৈধ পথে হীরা আমদানিতে উচ্চ শুল্ক একটি বড় বাধা। বন্ড সুবিধা ছাড়া অমসৃণ হীরায় কর প্রায় ৮৯ শতাংশ এবং মসৃণ হীরায় প্রায় ১৫১ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে উচ্চ শুল্ক এড়িয়ে অবৈধ পথে হীরা দেশে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।বাজুসের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও হীরার অলংকার অবৈধ পথে প্রবেশ করে। এর মধ্যে হীরার অবৈধ বাজারের বার্ষিক মূল্য প্রায় ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা বলে সংগঠনটি দাবি করেছে।
অন্যদিকে বাজারে শুধু চোরাচালানের হীরাই নয়, ল্যাবে তৈরি হীরা এবং মোজানাইট বা জারকনের মতো দেখতে পাথরকেও আসল হীরা হিসেবে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ফলে কম দামে হীরার গয়না কিনতে গিয়ে ক্রেতারা প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
৫ হাজার টাকায় হীরার নাকফুল কতটা সম্ভব?
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আসল প্রাকৃতিক হীরার দাম এবং মাত্র কয়েক হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া ‘ডায়মন্ড’ পণ্যের দামের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। তাই কম দামের কোনো গয়নায় প্রাকৃতিক হীরা রয়েছে কি না, শুধু বিক্রেতার দাবি শুনে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।এ ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জেমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরির সনদ, হীরার গ্রেডিং রিপোর্ট, ক্যারেট, কাট, কালার ও ক্ল্যারিটি সম্পর্কে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চোরাচালানের প্রমাণ মিলছে সীমান্তে
দেশে হীরা চোরাচালানের অভিযোগ যে কেবল ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন সময়ে সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দ করা চালানেও তার প্রমাণ মিলেছে।চলতি বছরের ২ এপ্রিল যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের নতুনহাট এলাকায় বিজিবির অভিযানে ভারতীয় নাগরিক সুজাউদ্দিনকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে ১৫৫ দশমিক ৬৭ গ্রাম হীরা এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হীরাসহ মালামালের মোট মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৬২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বলে জানিয়েছে বিজিবি।এ ধরনের একাধিক ঘটনায় সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে হীরা দেশে প্রবেশের অভিযোগ সামনে এসেছে।
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি টাকার মামলা
দেশের হীরার বাজার নিয়ে আলোচনায় বড় একটি নাম ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড। প্রতিষ্ঠানটির মালিক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার বেশি মানিলন্ডারিংয়ের মামলা করে সিআইডি।সিআইডির অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি এলসির মাধ্যমে প্রায় ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার পণ্য বৈধভাবে আমদানি করলেও একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে প্রায় ৬৭৮ কোটি টাকার স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহের তথ্য পাওয়া যায়, যার বৈধ উৎসের নথি দেখাতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হয়েছে বলে সিআইডির দাবি।তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
নকল হীরার ঝুঁকি
বাজারে প্রাকৃতিক হীরার পাশাপাশি ল্যাবে তৈরি ডায়মন্ড, মোজানাইট ও জারকনের মতো পাথর নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। দেখতে অনেকটা একই রকম হওয়ায় সাধারণ ক্রেতার পক্ষে খালি চোখে পার্থক্য করা কঠিন।বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো গয়না কেনার আগে শুধু ‘অরিজিনাল ডায়মন্ড’ লেখা বা বিক্রেতার মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে পণ্য পরীক্ষা করা জরুরি।একই সঙ্গে বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের উৎস, আমদানির কাগজপত্র এবং স্বীকৃত জেমোলজিক্যাল ল্যাবের সার্টিফিকেট চাওয়া উচিত।
নীতির পরিবর্তন চায় ব্যবসায়ীরা
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হীরার ওপর উচ্চ শুল্ক এবং জটিল আমদানি প্রক্রিয়া বৈধ ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে অবৈধ চোরাচালান ও নকল হীরার বাজার ঠেকাতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।তাদের মতে, হীরার আমদানিতে শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, বন্ড সুবিধা সহজ করা, বৈধ আমদানি-রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো এবং জুয়েলারি খাতে নীতি সহায়তা দেওয়া হলে দেশে একটি স্বচ্ছ হীরার বাজার গড়ে উঠতে পারে।এতে সরকার যেমন রাজস্ব পাবে, তেমনি বৈধ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ক্রেতারা আসল হীরা কিনছেন নাকি নকল পণ্য, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন।
১১ হাজার কোটি টাকার বাজারে যখন বৈধ আমদানির চিত্র এতটা সীমিত, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়—দেশের বাজারে এত হীরা আসছে কোথা থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি এবং নকল হীরার ব্যবসার ওপর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


