
‘গ্রিন টেক ল্যাব’ প্রকল্পে জাতীয় পর্যায়ে রৌপ্য, এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের স্বপ্ন
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
প্রত্যন্ত দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ থেকে উঠে এসে রোবোটিকস ও প্রযুক্তির জগতে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন তরুণ জিহাদ শাহরিয়ার। জাতীয় পর্যায়ের ফিবোনাচ্চি অলিম্পিয়াডে তাঁর দল ‘গ্রিন এন্টারপ্রেনিউরশিপ’ বিভাগে রৌপ্যপদক অর্জন করেছে। এ সাফল্যের সুবাদে আগামী নভেম্বরে ইতালির রোমে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ফিবোনাচ্চি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিযোগিতা। এতে জিহাদ শাহরিয়ারের পাঁচ সদস্যের দল ‘গ্রিন এন্টারপ্রেনিউরশিপ’ বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। প্রতিযোগিতায় স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জপদক পাওয়া দলগুলো আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। সেই ধারাবাহিকতায় জিহাদদের দলও পেয়েছে ইতালি যাওয়ার সুযোগ।
জিহাদ শাহরিয়ার ২০১৮ সালে সন্দ্বীপ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মাধ্যমিকে তিনি ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ছাত্র ছিলেন। পরে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। ২০২৩ সালে ভর্তি হন ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেই নতুন করে রোবোটিকসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই তিনি সেখানকার ‘মার্স রোভার টিম’ সম্পর্কে জানতে পারেন। ভর্তি হওয়ার পর সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে শুরু করেন রোবোটিকস শেখা। ধীরে ধীরে যন্ত্রের নকশা, ইলেকট্রনিকস, প্রোগ্রামিং, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কম্পিউটার ভিশন ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন।
তবে প্রযুক্তির প্রতি তাঁর আগ্রহের শুরু আরও আগে। সন্দ্বীপে রোবোটিকস শেখার তেমন কোনো সুযোগ না থাকায় নষ্ট রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ার কিংবা খেলনা গাড়ি খুলে খুলে নিজের মতো করে প্রযুক্তি বোঝার চেষ্টা করতেন জিহাদ। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে রোবোটিকস ও প্রযুক্তি নিয়ে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করে। জিহাদের ভাবনা, প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের যেমন প্রযুক্তি শেখার সুযোগ প্রয়োজন, তেমনি শহরের শিশুদেরও প্রকৃতি ও কৃষির সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার। এই ধারণা থেকেই তিনি তৈরি করেন ‘গ্রিন টেক ল্যাব’ মডেল—একটি ‘স্মার্ট গ্রিন লার্নিং ইনিশিয়েটিভ’।
এই প্রকল্পে কৃষি, প্রকৃতি ও প্রযুক্তিকে একই সঙ্গে শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে উদ্ভিদ চাষের পাশাপাশি সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পানির বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটির মাধ্যমে এসব তথ্য দূর থেকে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে প্রকল্পটিতে। জিহাদ জানান, জাতীয় প্রতিযোগিতার জন্য মাত্র এক মাসের প্রচেষ্টায় পাঁচ সদস্যের দল মিলে ‘গ্রিন টেক ল্যাব’ প্রকল্পের মডেলটি তৈরি করে। স্বল্প সময়ে তৈরি প্রকল্পটি জাতীয় পর্যায়ে রৌপ্যপদক অর্জন করায় তিনি ও তাঁর সতীর্থরা উচ্ছ্বসিত।
ফিবোনাচ্চি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নাসির জানান, জিহাদ শাহরিয়ারের দল জাতীয় পর্যায়ে রৌপ্যপদক অর্জন করেছে। স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জপদকপ্রাপ্ত প্রতিযোগীরা আগামী নভেম্বরে ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নেবেন। জিহাদের স্বপ্ন এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরা। তাঁর ভাষায়, সন্দ্বীপের মতো প্রত্যন্ত এলাকার কোনো শিশুকে রোবোটিকস ও STEM প্রযুক্তি শেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। জন্মস্থান যেন কোনো শিশুর শেখার সুযোগ নির্ধারণ না করে—এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান তিনি। উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান, সংগঠন কিংবা পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা পেলে ‘গ্রিন টেক ল্যাব’ প্রকল্পটি আরও এগিয়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চান সন্দ্বীপের এই তরুণ উদ্ভাবক।
সন্দ্বীপের মাটি থেকে শুরু হওয়া জিহাদের এই প্রযুক্তিযাত্রা এখন পাড়ি জমাচ্ছে ইতালির রোমে—সঙ্গে থাকছে বাংলাদেশের পতাকা ও নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বড় স্বপ্ন।


