
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার দোহাজারী–রামু–কক্সবাজার রেলপথ এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ২০১০ সালে অনুমোদিত এই মেগা প্রকল্পের মূল পরিকল্পনায় শুধু কক্সবাজার পর্যন্ত নয়, রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুন্দুম পর্যন্ত ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে রেললাইন নির্মাণের লক্ষ্যও ছিল। তবে পরিবর্তিত বাস্তবতা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং আর্থিক বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত গুন্দুম অংশটি বাস্তবায়ন করা হয়নি।
২০১০ সালের ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত একনেক সভায় “দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন গুন্দুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ” প্রকল্প অনুমোদন পায়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন, প্রকল্প সংশোধন, সময় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি কারণে ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছে।প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০২ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া দেশের প্রথম আইকনিক কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন, একাধিক নতুন রেলস্টেশন, অসংখ্য সেতু, কালভার্ট এবং আধুনিক রেল অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে দুইটি প্যাকেজে প্রকল্পের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের রেল যোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা হয়।প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনায় রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুন্দুম পর্যন্ত প্রায় ২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল সীমান্ত পরিস্থিতি, আন্তঃদেশীয় রেল সংযোগে অগ্রগতির অভাব এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ওই অংশটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্পটিতে ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগিন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বকালে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমন্বয়, বাস্তবায়ন তদারকি এবং নীতিগত বিষয়গুলো এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা সংশ্লিষ্ট মহলে ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর দায়িত্বকালেই রামু–গুন্দুম অংশটি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, মিয়ানমারের সীমান্ত পরিস্থিতি এবং প্রকল্পের আর্থিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় ওই অংশটি মূল প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। এর ফলে সরকারের প্রায় ৬ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং প্রকল্পটি আরও বাস্তবসম্মত কাঠামোয় সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ এখন শুধু একটি নতুন রেললাইন নয়; এটি দেশের পর্যটন, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে রামু–গুন্দুম অংশ পুনরায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনাও নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে।


