সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
spot_img

হামে আক্রান্ত দুই সন্তানের পাশে থেকে অসুস্থ মা, শেষ পর্যন্ত মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিন-রাত সেবা করতে গিয়ে নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন লেংরুং ম্রো (২৬)। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও অর্থাভাবে তাঁকে গ্রামের বাড়ি রুমা উপজেলার দুর্গম চিনিপাড়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কবিরাজি চিকিৎসার জন্য নেওয়ার পর গত ২৯ জুলাই বিকেলে তাঁর মৃত্যু হয়।বর্তমানে তাঁর চার বছরের মেয়ে দংওয়াই ম্রো বান্দরবান সদর হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। মায়ের মৃত্যুর খবর এখনো জানে না শিশুটি।শনিবার বিকেল চারটার দিকে বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আক্রান্তদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, দংওয়াই ম্রো বিছানায় শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। গত শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ছয় নম্বর বেডে তার ভাই কাইনওয়াই ম্রোর সঙ্গেও ছিল সে। কাইনওয়াই সুস্থ হয়ে ওঠায় শুক্রবার দুপুরে এক আত্মীয় তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।

দংওয়াইয়ের বিছানার পাশে বিমর্ষ মুখে বসেছিলেন তার চাচা ক্রংতং ম্রো (১৯)। নিজের চোখের পানি আড়াল করে কখনো ভাইঝির দিকে তাকাচ্ছিলেন, আবার কখনো তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। শিশুটি কখনো চাচার কোলে মাথা রাখছিল, আবার কখনো কান্না করছিল।ক্রংতং ম্রো জানান, তাঁদের বাড়ি বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম গ্যালেঙ্গা ইউনিয়নের চিনিপাড়া গ্রামে। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তাঁর ভাবি লেংরুং ম্রো বড় ছেলে তাইলেং ম্রোকে (৭) হাম আক্রান্ত অবস্থায় বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চারদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে তাইলেং বাড়ি ফিরে যায়।এরপর গত ২৬ জুলাই লেংরুং ম্রো সুস্থ অবস্থায় হাম আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে আবারও বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে থেকেই তিনি সন্তানদের সেবা-যত্ন করছিলেন। কিন্তু ২৮ জুলাই হঠাৎ তিনিও অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে পরিবারের আর্থিক সংকট ও চট্টগ্রামে চিকিৎসার খরচ নিয়ে ভয় থেকে তাঁকে সেখানে নেওয়া হয়নি।ক্রংতং ম্রো বলেন, তাঁর বড় ভাই ক্রংসং ম্রো (২৮) অক্ষরজ্ঞানহীন এবং বাংলা ভাষাও ভালোভাবে বলতে পারেন না। হাতে টাকা না থাকায় তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নিয়ে আতঙ্কিত ছিলেন। এ কারণে স্ত্রীকে চট্টগ্রামে না নিয়ে গ্রামের বাড়িতে কবিরাজি চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। দুই সন্তানকে দেখাশোনার দায়িত্ব দেন ছোট ভাই ক্রংতং ম্রোর ওপর।

২৯ জুলাই বিকেলে লেংরুং ম্রোকে নিয়ে তাঁরা গ্রামে পৌঁছান। সেদিনই তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন ৩০ জুলাই পারিবারিকভাবে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।ক্রংতং ম্রো বলেন, “হাসপাতালের নার্সরা জানিয়েছেন, অসুস্থ সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে ভাবিও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।”এদিকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর শিশুদের বাবা ক্রংসং ম্রোও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী। ফলে পরিবারের তিন শিশুর দেখাশোনা, চিকিৎসা এবং হাসপাতালে দিন-রাত অবস্থানের পুরো দায়িত্ব এখন ক্রংতং ম্রোর কাঁধে।হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা দংওয়াই ম্রো অপলক দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে থাকে। যেন পরিচিত কাউকে খুঁজছে। কখনো চাচার কোলে মাথা রাখছে, আবার কখনো কান্নায় ভেঙে পড়ছে। কিন্তু তার জানা নেই, যাকে সে খুঁজছে সেই মা আর কখনো ফিরে আসবেন না।

রুমায় হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকরুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং সময়মতো টিকা না পাওয়ায় এসব এলাকার শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে।

বান্দরবান সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের হাম আক্রান্তদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ১৫ শিশু, ৬ নারী ও ৩ পুরুষ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।চলতি বছরে বান্দরবান জেলায় হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৯ জন।দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে দ্রুত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত ওষুধ ও টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা জরুরি হয়ে উঠেছে। লেংরুং ম্রোর মৃত্যু সেই সংকটেরই এক করুণ প্রতিচ্ছবি।

- Advertisement -spot_img

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত