
বয়স যে শিক্ষার পথে কোনো বাধা নয়, তা প্রমাণ করলেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার আলী আকবর। দীর্ঘ ৪৩ বছর পর আবারও পড়াশোনায় ফিরে ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪ দশমিক ৩৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এর আগে তিনি নিজের ছেলে ও মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ছেলে হয়েছেন চিকিৎসক, আর মেয়ে নার্স। আলী আকবর পেশায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মী। তাঁর বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া পৌর সদরে। তিনি রাজশাহীর নওহাটা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি উচ্চবিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার বিল্ডিং মেইনটেন্যান্স ট্রেড থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।
আলী আকবর বলেন, ‘পড়ালেখার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায় সাফল্য এনে দিতে পারে। এই সত্যটাকে আমি প্রতিষ্ঠিত করেছি।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে আলী আকবর দ্বিতীয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় ছোটবেলায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রামের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করলেও অষ্টম শ্রেণির পর ১৯৮৩ সালে তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে তিনি বাবাকে সংসারের কাজে সহযোগিতা করতে শুরু করেন। ১৯৯০ সালে বিয়ে করেন তিনি। পরবর্তীতে এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্মের পর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রাজশাহীতে চলে যান আলী আকবর। সেখানে তিনি ও তাঁর স্ত্রী একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি নেন। সীমিত আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো ছিল তাঁদের জন্য কঠিন। তারপরও সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে কোনো আপস করেননি তাঁরা।
২০১৫ সালে তাঁর মেয়ে নার্সিং পাস করেন। এরপর ছেলেকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করান। ২০১৯ সালে ছেলে ইসমাইল হোসেন এমবিবিএস পাস করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। বর্তমানে তিনি ৪২তম বিসিএসের মাধ্যমে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সন্তানরা পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর নিজের অসমাপ্ত পড়াশোনার স্বপ্ন আবারও দেখতে শুরু করেন আলী আকবর। বিষয়টি স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করলে তাঁরাও তাঁকে উৎসাহ দেন। এরপর তিনি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিয়মিত পড়াশোনা শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেন।
আলী আকবর বলেন, ‘আজকাল অনেক ছেলেমেয়ে দিনরাত মোবাইল দেখে সময় নষ্ট করে। পরীক্ষা দিয়ে ফেল করে। আমি তাদের দেখাতে চেয়েছি—ইচ্ছাশক্তি ও মনোবল থাকলে সাফল্য আসবেই।’
সন্তানদের পড়াশোনার সময় মোবাইল ব্যবহারের বিষয়েও কঠোর ছিলেন তিনি। তাঁর ছেলে মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষে ওঠার পর মোবাইল ব্যবহার শুরু করেন। আর মেয়ে নার্সিং পাস করার পর মোবাইল হাতে নেন। আলী আকবরের ছেলে চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘বাবা পারিবারিক আলোচনায় আবার লেখাপড়া শুরু করার কথা বলতেন। আমরা তাঁকে উৎসাহ দিয়েছি। স্কুলে ভর্তির সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি এবং লেখাপড়ায় সহযোগিতা করেছি। বাবা এসএসসি পাস করায় আমরা ভীষণ খুশি। আমরা চাই, বাবা আরও পড়ালেখা করুন।’ ৫৪ বছর বয়সে আলী আকবরের এই সাফল্যে তাঁর পরিবার, স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর গল্প শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা নয়; বরং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে বয়সকে জয় করার এক অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত।


